chuni goswami : ফুটবলে মাত বিশ্ব, ক্রিকেটে তিনিই রঞ্জি অধিনায়ক! ময়দানের আকাশে মিলিয়ে গেল ফিনিক্স পাখি – chuni goswami obituary: a footballer and a cricketer always donned the mohun bagan jersey and is a club legend

0
11
Print Friendly, PDF & Email

এই সময় ডিজিটাল ডেস্ক: ‘চুনী গোস্বামীকে চেনো?’ লোকাল ট্রেনের এক আলোচনায় ষাটোর্ধ্ব প্রবীণের প্রশ্নের জবাবে থতমত খেয়ে উঠতি যুবক উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ, চিনব না কেন? ফুটবলার চুনী গোস্বামী তো!’ আরও চেপে ধরেন প্রবীণ। ‘ক্রিকেটার চুনী গোস্বামীকে চেনো?’ মাথায় হাত চলে যায় যুবকের। ‘ক্রিকেটার চুনী গোস্বামী! সে আবার কে?’ চুনী গোস্বামী- ফুটবল পোড়া দেশের এক কিংবদন্তী, ফুটবল সম্রাট পেলের বন্ধু, ভারতের কপালে এশিয়ান গেমসের সোনার মেডেল ছোঁয়ানো চুনী গোস্বামী আসলে ক্রীড়া জগতের এক অসীম বিস্ময়!

কেন? প্রশ্নের জবাব দিতে পারে বোধহয় শুধু পরিসংখ্যানই। চুনী গোস্বামীর নেতৃত্বে ১৯৬২ সালে এশিয়ান গেমসে সোনা জেতে ভারত। ১৯৬৪ সালের এশিয়া কাপে সেই তাঁর নেতৃত্বেই রুপো জয় দেশের। সেই তিনিই কিনা অল রাউন্ডার হিসেবে খেলেছেন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটও। শুধু কি খেলা, ১৯৬২-৬৩-তে বাংলার হয়ে রঞ্জি অভিষেক তাঁর। বাংলাকে নেতৃত্ব দিয়ে রঞ্জি ফাইনাল পর্যন্তও নিয়ে গিয়েছিলেন সেই মানুষটাই। আবার তিনিই কিনা হকি স্টিক নিয়ে মাঠে নামলে চমকে যেত বিপক্ষ।

সেরা চুনী

লক্ষ্মীবারের সন্ধ্যায় সেই চুনীই চলে গেলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা থমকে দিয়েছিল স্বাভাবিক জীবনযাপন। কিন্তু চুনী গোস্বামী নামটা শুনলেই যেন ঘাড় ঝাড়া দিয়ে উঠত ভারতীয় ক্রীড়াক্ষেত্র। লেজেন্ড, কিংবদন্তীর মতো শব্দ জীবদ্দশাতেই শুনতে-শুনতে ক্লিশে হয়ে গিয়েছিল চুনীর জন্য। তিনি আসলে ছিলেন ফিনিক্স পাখি। ছাইচাপা ময়দানে উড়ে বেড়াতেন, ঘুরে বেড়াতেন, দৌড়ে বেড়াতেন এক অনির্দিষ্ট লক্ষ্যে। ভারত বিশ্বকাপ পায়নি, ভারত চুনীকে পেয়েছে।


বাংলাদেশে তাঁর জন্ম। তবে বেশিদিন থাকেননি। ১৯৪৬ সালে এপারে চলে এসেছেন। আর ধীরেধীরে মোহনবাগান ক্লাব হয়ে উঠেছিল তাঁর হৃদপিণ্ড। বাঙালের হৃদপিণ্ড ঘটির মোহনবাগান! কম কথা হয়নি তা নিয়ে। কিন্তু চুনী ছিলেন খেলার সেনাপতি। যুদ্ধক্ষেত্র তাঁর কাছে ছিল কেবল ওই সবুজ গালিচাই। কলকাতা ময়দানে চুনীর পা কী খেল দেখাচ্ছে, সেই খবর পৌঁছে গিয়েছিল ইংল্যান্ডের টটেনহ্যামের মতো ক্লাবে। তাঁকে নিয়ে যেতে টাকার টোপ দিয়েছিল বিশ্বখ্যাত সেই ক্লাবের কর্তারা। যাননি। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত দাপিয়ে খেলেছেন প্রাণের চেয়েও প্রিয় মোহনবাগানে। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত ৫ টি মরসুমে বাগান অধিনায়কের আর্ম ব্যান্ড ছিল তাঁরই হাতে বাঁধা। দেশের হয়ে করেছেন ১১ টি গোল। যদিও গোল সংখ্যা দিয়ে চুনীকে মাপা, আর এভারেস্টকে বরফের ওজন দিয়ে মাপা সমান!

বন্ধু আমার…

পেলে তাঁকে জাপটে ধরতেন, হ্যাঁ পেলে। চুনীর অনর্গল প্রশ্নের সামনে বসে বয়সের ভারে ন্যুব্জ ফুটবল সম্রাটও নিজের অভিজ্ঞতার দ্বার খুলে দিতেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নামজাদা ফুটবলাররাও ভারতীয় ফুটবল শুনলেই বলে উঠতেন, ‘চুনী গোস্বামীর দেশ!’ সে দেশেই আর চুনী গোস্বামী রইলেন না। পাড়ি দিলেন জীবনের সীমান্তের ওপারে।

এক সাক্ষাৎকারে বছর কয়েক আগে বলেছিলেন, ‘স্বামীজি বলেছেন, গীতা পাঠের থেকে ফুটবল খেললে অনেক বেশি ভাল থাকে শরীর ও মন।’ বয়সের নিয়মেই ফুটবলে পা পড়ত না অনেকদিন, তাই কি ‘শরীর ও মন’ পাড়ি দিল অন্য কোথাও? বলেছিলেন, ‘এক একটা মৃত্যু মনটাকে ভারাক্রান্ত করে। থঙ্গরাজ, জার্নেল, প্রশান্ত সিনহা, প্রদ্যোৎ বর্মন, আরও অনেকের চলে যাওয়া মানতে কষ্ট হয়। সবচয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম কৃশানুর অকাল মৃত্যুতে।’ মৃত্যু যাঁকে বেদনা দিত, তাঁর সঙ্গেই আজ বন্ধুত্ব জমালেন ফুটবল যাদুকর।

বিদায় যাদুকর

আসল নাম সুবিমল গোস্বামী, ডাক নাম চুনী। সেই ডাক নামেই তাঁকে ডেকে গেল গোটা বিশ্ব। ‘অকালে রিটায়ার করলেন কেন?‌’ প্রশ্নের জবাবে তাঁর উত্তর ছিল, ‘ফর্মে থাকতেই সরে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি আর গাভাসকার এমনটা করেছি। কেউ যাতে বলতে না পারে, এখনও খেলে যাচ্ছে, ছাড়ছে না কেন?’ চুনীকে এমন কি বলত কখনও কেউ? চুনী কি বলতে দিতেন? চুনীকে যে আর বলা যাবে না কখনও ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট! আপনি থাকছেন স্যার।’ ফুটবল নিয়ে না দৌড়লেও আপনিই ভারতীয় ফুটবলের শীর্ষ আসনটা ছুঁয়ে থাকবেন।

ভাইরাস মোড়া এক অন্ধকার সময়ে ইরফান খান, ঋষি কাপুরের মতো আলোকিত তারারা দূরে চলে গেলেন। হঠাৎ করে চলে গেলেন চুনীও। শেষ ইচ্ছে ছিল মৃত্যুর পর দেশ আর ক্লাবের পতাকাটা যেন তাঁর মরদেহের উপর রাখা হয়। রাখা হোক পতাকা। দেশের এমন এক সন্তানের নিস্তব্ধ শরীরের উপরই তো মানায় তা। পিকে বন্দ্যোপাধ্যায় ‘অপেক্ষা’ করছেন তাঁর জন্য, তাঁর দিকেই এগিয়ে চলেছেন চুনী। তৈরি হবে ‘ডুয়েট’। ছোট্ট টাচ, মাঠ কাঁপানো স্কিল, গোওওওওললল… বিদায় ম্যাজিক ম্যান।



Source link