মুহাম্মদ আখতারুজ্জামান


আমানুল্লাহ বিন ইসমাঈল সালাফির বক্তব্য

ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু এজিদ বিন মুয়াবিয়া রাহিমাহুল্লাকে ভাল চোখে দেখতেন। এজিদ হলেন প্রখ্যাত তাবেয়ি। ইউরোপের কনস্টানটিনোপলের যুদ্ধে সৈনিক হিসেবে তিনি সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন। নবী (ﷺ) এর ভবিষতবাণী আল্লাহর নবী বলেছেন:

من اشترك فى غزوة قستنطنية كلهم مغفور

অর্থাৎ যারা কুস্তুনতুনিয়ার যুদ্ধে অংশ নিবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত।

এজিদ বিন মুয়াবিয়া রাহিমাহুল্লাহু মুসলিম রাষ্ট্রকে প্রতিষ্টা ও মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তার করার জন্য তার বিশেষ অবদান ছিল এবং কনস্টানটিনোপলের যুদ্ধে বাপ বেটা দু’জনই সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। আল্লাহর কসম করে বলছি ঐ হতভাগা আলেম আর ঐ হতভাগা যালেম সে হাদিস পড়ে নাই কুরআন পড়ে নাই ইতিহাস জানে না। এজিদ বিন মুয়াবিয়াকে গালি গালাজ করছে ওয়াজের নামে, বিচারের কাঠগড়ায় তাদের অবস্থাতো খুব খারাপ হবেই। আর যে সমস্ত শ্রোতারা শুনবেন এই সমস্ত বাজে মিথ্যা গল্প আর শুনে শুনে এগুলির উপর একিন করে এজিদ রাহিমাহুল্লাহুকে কাফির ফতোয়া দিবেন এবং তাকে বেদ্বীন, যালেম অনেক কিছু বলবেন তাদের পরিনতি ও খুব খারাপ হবে। (ইউটুব থেকে সংগৃহীত)

মুফতি মুয়াজ্জেম হোসেনের বক্তব্য


মুফতি মুয়াজ্জেম হোসেনের বক্তব্য

এজিদ আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ ও করেছিল। জানেন এবার হাদিসতো দিব আমি বুখারি থেকে। এবার পারলে আপনি এজিদের ব্যাপারে সমালোচনা করে বুখারির হাদিসটি উল্টান। বুখারির সমুদ্র অভিযান। কিতাবুল জিহাদ ৪০৯৩ নাম্বার হাদিসটি বের করবেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন:

وعن عبيدة ابن زياب رضي الله تعالى عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم اول جيش من امتى يغزون البحر وقد اوجبوا-

অর্থাৎ আমার উম্মতের মধ্যে কোন যুবক যদি, আমার উম্মতের মধ্যে কোন মানুষ যদি সমুদ্রের অভিযানের কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার জন্য জান্নাতকে ওয়াজিব বানাইয়া দেন।

এজিদের নেতৃত্বে ৫১ হিজরিতে ইমাম হোসাইন তার পিছনে থেকে এজিদের সেনাপতিত্বের নেতৃত্বে কনস্টানটিনোপলের যুদ্ধে গিয়েছেন। (ইউটুব থেকে সংগ্রহীত)

পর্যালোচনা

সম্মানিত পাঠকবর্গ, আপনারা উল্লেখিত আমানুল্লাহ ও মোয়াজ্জেম সাহেবের বক্তব্য দুটি একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে বুঝতে পারবেন তারা উভয়েই এজিদকে ক্ষমাপ্রাপ্ত বানাতে গিয়ে বুখারি শরীফের একটি হাদিসকে দালিলিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল তারা উভয়েই স্বীয় মাশুকের গুণকীর্তন করতে গিয়ে মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন।

আমানুল্লাহ সাহেবতো হাদিসের ইবারতকেই পরিবর্তন করে নিজের সুবিধামত একটি ইবারত বানিয়ে নিয়েছেন তিনি বলেছেন: নবীজি (ﷺ) বলেছেন:

من اشترك فى غزوة قستنطنية كلهم مغفور

অর্থ: যারাই কুস্তুনতুনিয়ার যুদ্ধে অংশ নিবে তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত। ইহা তার সম্পূর্ণ মনগড়া ও স্বরচিত হাদিস। আমি কিছুক্ষণ পরে মূল হাদিসটি উপস্থাপন করব ইংশাআল্লাহ।

আবার মোয়াজ্জেম সাহেব হাদিসের ইবারতটি রেখে সুকৌশলে অর্থকে পরিবর্তন করে বলেছেন:

নবীজি বলেছেন: আমার উম্মতের কোন ব্যক্তি যদি সমুদ্র অভিযানের কোন যুদ্ধে অংশ নেয় তাহলে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে।

আবার উভয়ের বক্তব্য যদি একসাথে যোগ করি তাহলে দেখা যাবে তাদের দু’জনের কথা দু’রকম। একজন বলছেন কুস্তুনতুনিয়ার যুদ্ধের কথা, অন্যজন বলছেন সমুদ্রে অভিযানের কথা। আসলেও কিন্তু ইহা ভিন্ন দুটি অভিযান ছিল।

আসল কথা হল এ সমস্ত সালাফি ভাইয়েরা স্বীয় মুনীবকে ক্ষমাপ্রাপ্ত ও জান্নাতি সাজাতে গিয়ে বুখারি শরীফের হাদিসকে পরিবর্তন করতে ও এদের বুক কাঁপে না।

তাই আসুন আমরা প্রথমে এ প্রসঙ্গে বুখারিশরীফে বর্ণিত মুল হাদিসটি দেখি।

কুস্তুনতুনিয়ার ব্যাপারে বুখারি শরীফের মূল হাদিস


কুস্তুনতুনিয়ার ব্যাপারে বুখারি শরীফের মূল হাদিস

✦ ইমাম বুখারি আলাইহির রহমত স্বীয় গ্রন্থে কিতাবুল জিহাদ অধ্যায়ে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন নিম্নরুপ:

عن ام حرام انها سمعت النبى صلى الله عليه وسلم يقول اول جيش من امتى يغزون البحر قد اوجبوا- قالت ام حرام- قلت يا رسول الله انا فيهم؟ قال انت فيهم- ثم قال النبى صلى الله عليه وسلم اول جيش من امتى يغزون مدينة قيصر مغفورلهم فقلت انا فيهم يا رسول الله؟ قال لا-

অর্থ: উম্মে হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত তিনি নবী করিম (ﷺ) থেকে শুনেছেন: নবীজি বলেছেন- আমার উম্মতের প্রথম দল যারা সাগর পথে অভিযান করবে তাদের জন্য জান্নাত ওয়াজিব হবে। তখন উম্মে হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ আমি কি তাদের সাথে থাকব? রাসূল (ﷺ) বললেন: ‘তুমি তাদের সাথে থাকবে? অতঃপর রাসূল (ﷺ) বললেন: আমার উম্মতের প্রথম দল যারা কায়সারের শহরে অভিযান করবে তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত। তখন উম্মে হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ আমি কি তাদের সাথে থাকব? নবীজি বললেন না’। (বুখারি হাদিস নং ২৯২৪)

বুখারি শরীফের হাদিসের ভাবার্থ ও এজিদ প্রেমীদের জালিয়াতি


বুখারি শরীফের হাদিসের ভাবার্থ ও এজিদ প্রেমীদের জালিয়াতি

বিজ্ঞ পাঠক মহলের নিকট সবিনয় আবেদন আপনারা আমুনুল্লাহ সাহেবের স্বরচিত হাদিস ও বুখারিশরীফে মূল হাদিসটি পাশাপাশি রেখে একটি খেয়াল করুন দেখেবেন উভয়ের মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান।

আবার মোয়াজ্জেম সাহেবের বক্তব্যটি ও এর সাথে তুলনা করুন দেখবেন সেখানেও চতুরতার আশ্রয় নেয়া হয়েছে। তারা উভয়েই اول جيش من امتى অর্থাৎ (আমার উম্মতের প্রথম বাহিনী) কথাটি সুকৌশলে এড়িয়ে যাবার অপচেষ্টা করেছেন। প্রথমজন তো ইবারতই পরিবর্তন করে ফেলেছেন। আর দ্বিতীয়জন ইবারত ঠিক রেখে অনুবাদের মধ্যে ধোকা দিয়েছেন।

রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: আমার উম্মতের প্রথম বাহিনী যারা সাগর পথে অভিযান করবে তাদের জন্য জান্নাত ওয়াজিব হবে। আবার উম্মতের প্রথম বাহিনী যারা কায়সারের শহরে আক্রমণ করবে তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত।

অথচ তারা উভয়েই প্রথম বাহিনী বা প্রথম অভিযান কথাটি বাদ দিয়ে একজন বললেন: যারাই কুস্তুনতুনিয়ার যুদ্ধে অংশ নিবে তারাই ক্ষমাপ্রাপ্ত। অন্যজন বললেন যে ব্যক্তি সাগর পথে যে কোন যুদ্ধে অংশ নিবে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হবে।

পাঠকদের বুঝার জন্য আমি একটি উদাহরণ পেশ করতে চাই, যদি একটি প্রতিযোগিতায় ঘোষণা করা হয় যে, উক্ত প্রতিযোগিতায় যারাই অংশগ্রহণ করবে তারা প্রত্যেকেই একশত টাকা করে পুরস্কার পাবে। তাহলে ভাল মন্দ ছোট-বড় সবাই এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যদি বলা হয়, শুধুমাত্র যারা প্রথম স্থান অর্জন করবে তারাই একশত টাকা করে পুরস্কার পাবে। তাহলে, প্রথম স্থান অর্জনকারী ব্যতীত অন্যান্যরা কোন পুরস্কার পাবে না।

ঠিক তেমনিভাবে হাদিসের মর্মবাণী হল শুধুমাত্র প্রথম অভিযানে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিগণই উক্ত সুসংবাদের আওতায় পড়বেন। অন্যান্য সময় অংশগ্রহণকারী কোন ব্যক্তি এর আওতায় পড়বেন না।

এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে মূল হাদিসে রাসূলেপাক (ﷺ) পৃথক দুটি অভিযানের কথা উল্লেখ করেছেন, প্রথমটি হল সাগর পথে অভিযান, যেটাতে উম্মে হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহা থাকবেন। আর দ্বিতীয়টি হল কায়সারের শহরে অভিযান, যেটাতে উম্মে হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহা থাকবেন না। এবং ইতিহাস ও তাই স্বাক্ষী দেয় যে, এই দুটি অভিযান ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সংঘটিত হয়েছিল।

অথচ উক্ত সালাফিগণ হাদিসের উভয় অংশটিকে একত্রিত করে গোজামিল সৃষ্টি করেছেন। তাই আমি পৃথকভাবে আলোচনা করব যে, সাগর পথে প্রথম অভিযান কখন হয়েছিল এবং কায়সারের শহরে কখন প্রথম অভিযান হয়েছিল।

ইয়াযীদ (লা) সম্পর্কে আহলুস্ সুন্নাহ’র সিদ্ধান্ত

সাগর পথে প্রথম অভিযান

সাগর পথে প্রথম অভিযান হয়েছিল হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু এর শাসনামলে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু এর নেতৃত্বে ২৭ অথবা ২৮ হিজরিতে। তখন এজিদ ছিল দুধের শিশু। কারণ এজিদের জন্ম হয়েছিল ২৫ অথবা ২৬ হিজরিতে। অতএব সাগর পথে প্রথম অভিযানে এজিদের অন্তভুর্ক্তি হাস্যকর ও অসম্ভব।

✦ এ ব্যাপারে ইমাম বুখারি স্বীয় গ্রন্থে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন নিম্নরূপ:

عن انس بن مالك عن خالته ام حرام بنت ملحان قالت نام رسول الله صلى الله عليه وسلم يوما قريبا منى ثم استيقظ يتبسم فقلت ما اضحكك؟ قال اناس من امتى عرضوا على يركبون هذا البحر الاخضر كالملوك على الاسرة- قالت فادع الله ان يجعلنى منهم فدعالها- ثم نام الثانية ففعل مثلها فقالت مثل قولها- فاجابها مثلها- فقالت ادع الله ان يجعلنى منهم- فقال انت من الاولين- فخرجت مع زوجها عبادة بن الصامت غازيا- اول ما ركب المسلمون البحر مع معاوية فلما انصرفوا من غزوتهم قافلين فنزلوا الشام قربت اليها دابة لتركبها فصرعتها فماتت-

অর্থ: আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর খালা উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমার বাড়িতে ঘুমাচ্ছিলেন। অতঃপর হঠাৎ মুসকি হাসি দিয়ে জাগ্রত হলেন। আমি বললাম, আপনি হাসছেন কেন? নবীজি বললেন: আমার উম্মতের কিছু লোককে আমার কাছে পেশ করা হল: তারা এই সবুজ সাগর পথে এমনভাবে আরোহন করবে যেমনি কোন বাদশাহ সিংহাসনে আরোহন করে। তিনি বললেন: আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তখন নবীজি তার জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর তিনি পুনরায় ঘুমিয়ে পড়লেন আবার পূর্বের ন্যায় জাগ্রত হলেন। উম্মে হারাম আবার বললেন: আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তখন নবীজি বললেন: তুমি প্রথম অভিযানে অন্তর্ভুক্ত হবে। আনাস রা বলেন: অতঃপর উম্মে হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর স্বামী উবাদাহ বিন সামিত রা. এর সাথে অভিযানে বের হন। আর ইহা ছিল মুসলমানদের সাগর পথে প্রথম অভিযান মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু এর নেতৃত্বে। অতঃপর যখন তারা উক্ত অভিযান থেকে কাফেলাবদ্ধ হয়ে ফিরছিলেন তখন তারা শামে অবতরণ করলেন। তখন উম্মে হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহা বাহন থেকে পড়ে গেলেন এবং শাহাদত বরণ করলেন। (বুখারি কিতাবুল জিহাদ ২৭৯৯)

উল্লেখিত হাদিসে সুষ্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, মুসলমানগণ সাগর পথে সর্বপ্রথম অভিযান করেছিলেন মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু এর নেতৃত্বে এবং সে অভিযানে উম্মে হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহাও ছিলেন।

✦ উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী বলেন:

وقوله اول ماركب المسلمون البحر مع معاوية كان ذالك فى سنة ثمان وعشرين فى خلافة عثمان-

অর্থ: হাদিসে বর্ণিত ‘সাগর পথে মুসলমানদের প্রথম অভিযান, হয়েছিল উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু এর শাসনামলে ২৮ হিজরিতে। (ফতহুল বারি ৬/২৩ পৃষ্ঠা)

✦ আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী উমদাতুল ক্বারী গ্রন্থে বলেন:

ذكر معناه (اول جيش من امتى يغزون البحر) ارادبه جيش معاوية- وقال المهلب معاوية اول من غزا البحر وقال ابن جرير قال بعضهم كان فى سنة سبع وعشرين وهى غزوة قبرس فى زمان عثمان بن عفان رضى الله عنه- وقال الواقدى كان ذالك فى سنة ثمان وعشرين-

অর্থ: হাদিসে বর্ণিত ‘সাগর পথে আমার উম্মতের প্রথম অভিযান’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বাহিনী। মুহাল্লাব বলেছেন: মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু সর্বপ্রথম সাগর পথে অভিযান পরিচালনা করেছেন। ইবনে জারির বলেছেন: কারো কারো মতে সে অভিযান হয়েছিল ২৭ হিজরি সনে। ইহাকে কাবরুসের যুদ্ধও বলা হয়। এ অভিযান হয়েছিল উসমান বিন আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহু এর শাসনামলে।

ওয়াকিদী বলেছেন: এ অভিযান হয়েছিল ২৮ হিজরি সনে। (উমদাতুল ক্বারী কিতাবুল জিহাদ)

✦ ইমাম জালাল উদ্দিন সুয়ুতি তারিখুল খোলাফা গ্রন্থে বলেন:

وفى سنة سبع وعشرين غزا معاوية قبرس فركب البحر بالجيوش وكان معهم عبادة بن الصامت وزوجته ام حرام بنت ملحان الانصارى فسقطت عن دابتها فماتت شهيدة هناك وكان النبى صلى الله عليه وسلم اخبرها بهذا الجيش ودعالها- بان تكون منهم فدفنت بقبرس-

অর্থ: হিজরি ২৭ সনে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু কাবরুস শহরে অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি সৈন্যবাহিনী নিয়ে সাগর পথে আরোহন করেন। এ বাহিনীর সাথে উবাদাহ বিন সামিত এবং তাঁর স্ত্রী উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রাদিয়াল্লাহু আনহা আল আনসারি ও ছিলেন। তখন উম্মে হারাম স্বীয় বাহন থেকে পড়ে গিয়ে শাহাদত বরণ করেন। রাসূলেপাক (ﷺ) তাকে এ বাহিনীর সংবাদ প্রদান করেছিলেন এবং তাঁর অন্তর্ভুক্তির জন্য দোয়াও করেছিলেন। অতঃপর তাকে কাবরুসেই দাফন করা হয়। (তারিখুল খোলাফা ১২৫ পৃষ্ঠা)

✦ হাফিজ ইবনে কাসির ‘বেদায়া ওয়ান নেহায়া’ গ্রন্থে বলেছেন:

ثم دخلت سنة ثمان وعشرين- فتح قبرس ففيها- وكان فتحها على يدى معاوية بن ابى سفيان- ركب اليه فى جيش كثيف من المسلمين ومعه عبادة بن الصامت وزوجته ام حرام بنت ملحان-

অর্থ: অতঃপর হিজরি ২৮ সন শুরু হল। এই বৎসরে সাগর পথে কাবরুস শহর বিজয় হয় এই অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহুমার নেতৃত্বে। মুসলমানদের বিরাট একটি বাহিনী উক্ত অভিযানে অংশ গ্রহণ করে। তাদের সাথে উবাদাহ বিন সামিত এবং তাঁর স্ত্রী উম্মে হারাম বিনতে মিলহানও ছিলেন। (বেদায়া ওয়ান নেহায়া)

উক্ত আলোচনা দ্বারা দিবালোকের ন্যায় সুষ্পষ্ট হয়ে গেল যে, সাগর পথে সর্বপ্রথম অভিযান হয়েছিল ২৭ হিজরি অথবা ২৮ হিজরিতে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু এর নেতৃত্বে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু এর যামানায়। অতএব সে অভিযানে এজিদের অন্তর্ভুক্তি গাজাখোরি গল্প বৈ কিছ্ইু নয়।

কায়সারের শহরে প্রথম অভিযান

পূর্বে উল্লেখিত বুখারি শরীফের দ্বিতীয় অংশ ছিল কায়সারের শহরে প্রথম অভিযান সম্বন্ধে। নবীজি বলেছেন ‘আমার উম্মতের প্রথম বাহিনী যারা কায়সারের শহরে আক্রমণ করবে তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত।

কায়সার হচ্ছে রোমান অধিপতিদের উপাধী। আর কায়সার যে শহরে অবস্থান করে শসন কার্য চালাত সে শহরকে কায়সারের শহর বা ‘মাদীনাতা কায়সার’ বলা হত। এখন উপরে বর্ণিত হাদিসে কায়সারের শহর বলতে কোন শহরকে বুঝানো হয়েছে তা সরাসরি হাদিসে উল্লেখ নাই। তাই উলামায়ে কেরামগণ এ বিষয়ে মতানৈক্য করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন কায়সারের শহর বলতে কুস্তুনতুনিয়াকে বুঝানো হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেছেন তা দ্বারা হিমস শহরকে বুঝানো হয়েছে।

কায়সারের শহর বলতে কোন শহরকে বুঝানো হয়েছে

দেখুন

✦ হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী আলাইহির রহমত এর বর্ণনা:

مدينة قيصر يعنى القسطنتنية وجوز بعضهم ان المراد بمدينة قيصر المدينة التى كان بها يوم قال النبى صلى الله عليه وسلم تلك المقالة وهى حمص- وكانت دار مملكته اذ ذاك

মাদীনায়ে কায়সার বলতে কুস্তুনতুনিয়াকে বুঝানো হয়েছে। তবে কেউ বলেছেন কায়সারের শহর বলতে ঐ শহরকে বুঝানো হয়েছে যে শহর রাসূলুল্লাহ (ﷺ) উক্ত হাদিস বর্ণনার সময় তার অধীনে ছিল। আর তা হল ‘হিমস’ কারণ তখনকার সময় হিমস শহরই ছিল রোমানদের রাজধানী। (ফতহুল বারি ৬ষ্ঠ খন্ড ১২০ পৃষ্ঠা)

ফতহুল বারীর উক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কায়সারের শহর বলতে কুস্তুনতুনিয়াও হতে পারে আবার হিমসও হতে পারে।

অতএব আমি নিম্নে উভয় শহরে পরিচালিত প্রথম অভিযান সম্বন্ধে আলোচনা করব এবং প্রমাণ করবো যে, এজিদ এতদুভয়ের কোনটাতেই প্রথম অভিযানে ছিল না।

হিমস শহরে প্রথম অভিযান


হিমস শহরে প্রথম অভিযান কখন হয়েছিল এ ব্যাপারে সরাসরি হাদিসে কোন বর্ণনা নাই। তাই আমি তারিখ গ্রন্থ থেকে আলোচনা করব। দেখুন কয়েকটি তারিখের বর্ণনা:

✦ হাফিজ ইবনে কাসির বেদায়া ওয়ান নেহায়া গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এভাবে:

ثم دخلت سنة خمسة عشرة- قال ابن جرير قال بعضهم فيها مصر سعد بن ابى وقاص الكوفة دلهم عليها ابن بقيله- قال السعد ادلك على ارض ارتفعت عن البق وانحدرت عن الفلاة فدلهم على موضع الكوفة اليوم قال وفيها كانت وقعه مرج الروم وذالك لما انصرف ابو عبيدة وخالد من وقعة فحل قاصدين الى حمص حسب ما امربه امير المؤمنين عمر بن الخطاب رضى الله تعالى عنه-

অর্থ: অতঃপর ১৫ হিজরি শুরু হল। ইবনে জারির বলেন: কেউ কেউ বলেছেন সে সময় সাদ বিন আবি ওয়াক্বাস কুফায় ছিলেন। তখন তিনি ইবনে বাকিলাহ নামক ব্যক্তির সাথে পরিচিত হলেন। তিনি সাদকে বললেন: আমি আপনাকে এমন একটি জায়গার সন্ধান দিব যা অন্যান্য জায়গা থেকে উচ্চ এবং মরুভূমি থেকে নিচু। অতঃপর তিনি তাদেরকে কুফার সন্ধান দিলেন এবং বললেন: এখানেই মারজে রোম অভিযান হয়েছিল।

ইহা তখনকার ঘটনা যখন আবু উবায়দাহ ও খালিদ ফাহল যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করেন। অতঃপর তারা আমিরুল মো’মিনন উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর নির্দেশক্রমে হিমস শহরের দিকে যাত্রা করেন। (বেদায়া ৯/৬৪৮ পৃষ্ঠা)

✦ অতঃপর ইবনে কাসির বর্ণনা করেন:

وقعة حمص الاولى: لما وصل ابو عبيدة فى اتباعه الروم المنهزمين الى حمص نزل حولها يحاصرها ولحقه خالد بن الوليد فحاصروا حصارا شديدا وذالك فى زمن البرد الشديد-

অর্থ: হিমসে প্রথম অভিযান: আবু উবায়দাহ যখন তাঁর বাহিনী নিয়ে রোমে পৌঁছলেন তখন তারা হিমস অভিমুখে রওয়ানা হলেন। অতঃপর খালিদ বিন ওয়ালিদ তার সাথে যোগদান করেন। মুসলমানগণ সেখানে কঠোর অবরোধ করেন। সে সময় প্রচন্ড শীত পড়েছিল। (বেদায়া ওয়ান নেহায়া: ৯/৬৪৯ পৃষ্ঠা)

✦ আল্লামা ইবনুল আসির ‘আল কামিল ফিত তারিখ’ গ্রন্থে বলেন:

ثم دخلت سنة خمس عشرة- فى هذه السنة كانت الوقعة بمرج الروم- وكان سبب ذالك ان ابا عبيدة وخالد بن الواليد سار بمن معهما من فحل قاصدين حمص فنزلا على ذى الكلاع-

অর্থ: অতঃপর ১৫ হিজরি শুরু হল। এ বৎসরেই মারজে রোম হয়েছিল। এ কারণে আবু উবায়দাহ এবং খালিদ বিন ওয়ালিদ তাদের সাথীদেরকে নিয়ে ‘ফাহাল’ থেকে হিমসের দিকে রওয়ানা হয়েছিলেন। অতঃপর তারা ‘যিলকিলা’ নামক স্থানে অবতরণ করেন। (আল কামিল ফিত তারিখ ৩/৩৩৮ পৃষ্ঠা)

✦ এর কয়েক লাইন পরে ইবনুল আসির আরো বর্ণনা করেন:

ذكر فتح حمص وبعلبك: فلما فرغ ابو عبيدة من دمشق سار الى حمص- فسلك طريق بعلبك فحاصرها فطلب اهلها الامان فامنهم وصالحهم وسار عنهم فنزل على حمص ومعه خالد- وقيل انما سار المسلمون الى حمص من مرج الروم-

অর্থ: হিমস ও বা’লা বাক্কা বিজয়ের বর্ণনা। অতঃপর আবু উবায়দাহ দামেস্কে অভিযান শেষ করে বা’লা বাক্কার পথ ধরে হিমসের দিকে রওয়ানা হলেন। অতঃপর তিনি সেখানে অবরোধ করলেন। তখন সেখানকার অধিবাসীগণ নিরাপত্তা প্রার্থনা করলে তিনি তাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করেন। অতঃপর তিনি খালিদকে সাথে নিয়ে সেখান থেকে হিমসে চলে গেলেন। কেউ কেউ বলেছেন: মুসলমানগণ মারজে রোম থেকেই সরাসরি হিমসে চলে গিয়েছিলেন। (আল কামিল ৩/৩৩৯ পৃষ্ঠা)

✦ ইমাম আবু জাফর আত তাবারী স্বীয় গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন:

ثم دخلت سنة خمس وعشرة وفى هذه السنة كانت الوقعة بمرج الروم وكان من ذالك ان ابا عبيدة خرج بخالد بن الوليد من فحل الى حمص-

অর্থ: অতঃপর ১৫ হিজরি প্রবেশ করল। এই বৎসরেই মারজে রোম নামক অভিযান সংঘটিত হয়েছিল। আর ইহা তখন হয়েছিল, যখন আবু উবায়দাহ এবং খালিদ বিন ওয়ালিদ ‘ফাহাল’ থেকে হিমসের দিকে রওয়ান হয়েছিলেন। (তারিখে তাবারী ৩/৫৯৯ পৃষ্ঠা)

সম্মানিত পাঠকবর্গ এ ব্যাপারে প্রায় সমস্ত তারিখ গ্রন্থেই একই রকম বর্ণনা এসেছে যে হিমস শহরে প্রথম অভিযান হয়েছিল ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর শাসনামলে ১৫ হিজরিতে। তার নেতৃত্বে ছিলেন আবু উবায়দাহ এবং খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা। তখন পাপিষ্ট এজিদের জন্মই হয়নি। অতএব হিমস শহরে প্রথম অভিযানে এজিদের অন্তর্ভুক্তি কল্পনাকেও হার মানায়।


Read More


কুস্তুনতুনিয়া শহরে প্রথম অভিযান: ৩২ হিজরি

আমি ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি যে, সাগর পথে প্রথম যুদ্ধে এজিদ ছিল না। এমনকি কায়সারের শহর বলতে যদি হিমস বুঝায় সেখানেও এজিদ ছিল না। এখন বাকি থাকল কায়সারের শহর দ্বারা যদি কুস্তুনতুনিয়া বুঝায় তাহলে সেখানে এজিদের অন্তর্ভুক্তি সম্বন্ধে আলোচনা। ইনশায়াল্লাহ আমিপ্রমাণ করব যে, কুস্তুনতুনিয়ার শহরে প্রথম অভিযানেও এজিদ ছিল না। হ্যাঁ পরবর্তীতে ৫০ হিজরির পরে একবার জোরপূর্বক এজিদকে সেখানে প্রেরণ করা হয়েছিল। সে ব্যাপারে আমি পরবর্তীতে আলোচনা করব। আসুন কয়েকটি কিতাব দেখি।

✦ হাফিজ ইবনে কাসির বেদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বর্ণনা করেন:

ثم دخلت سنة ثنتين وثلاثين- وفيها غزا معاوية بلاد الروم حتى بلغ المضيق مضيق القسطنتنية ومعه زوجته عاتكه-

অর্থ: অতঃপর ৩২ হিজরি শুরু হল। এ বৎসর মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু রোম দেশে অভিযান পরিচালনা করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কুস্তুনতুনিয়া শহর পর্যন্ত পৌঁছে যান। সে সময় তাঁর স্ত্রী আতিকাহ ও সাথে ছিলেন। (বেদায়া ১০/২৪৩ পৃষ্ঠা)

সম্মানিত পাঠকবর্গ ইবনে কাসিরের উক্ত বর্ণনায় সুষ্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ৩২ হিজরিতেই মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু কুস্তুনতুনিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যান। সে সময় এজিদ সবেমাত্র ৬ বৎসরের অবুঝ শিশু।

✦ আল্লামা ইবনুল আসির আল কামিল গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন:

ثم دخلت سنة اثنتين وثلاثين- قيل هذه السنة غزا معاوية بن ابى سفيان مضيق القسطنتنية ومعه زوجته عاتكه بنت قرظة-

অর্থ: অতঃপর ৩২ হিজরি শুরু হল। কেউ কেউ বলেছেন এই বৎসর মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান কুস্তুনতুনিয়া শহরে অভিযান পরিচালনা করেন। তখন তাঁর স্ত্রী আতিকাহ বিনতে কুরযাহও তার সাথে ছিলেন। (আল কামিল ৩/২৫ পৃষ্ঠা)

✦ ইমাম আবু জাফর আত তাবারী বর্ণনা করেন:

ثم دخلت سنة اثنتين وثلاثين- فمن ذالك غزوة معاوية بن ابى سفيان المضيق مضيق القسطنتنية ومعه زوجته عاتكه بنت قرظة-

অর্থ: অতঃপর ৩২ হিজরি শুরু হল। এ বৎসরেই মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু কুস্তুনতুনিয়া শহরে অভিযান পরিচালনা করেন। তাঁর সাথে তাঁর স্ত্রী আতিকাহও ছিলেন। (তারিখে তাবারী ৪/৩০৪ পৃষ্ঠা)

✦ ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবী স্বীয় তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন:

سنة اثنتين وثلاثين فيها كانت وقعة المضيق بالقرب من قسطنتنية واميرها معاوية-

অর্থ: ৩২ হিজরি সনে কুস্তুনতুনিয়া শহরে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ বাহিনীর আমির ছিলেন মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু (তারিখুল ইসলাম। ২/২০২ পৃষ্ঠা)

সম্মানিত পাঠকবর্গ উপরোল্লেখিত আলোচনা দ্বারা দিবালোকের ন্যায় প্রমাণিত হল যে, কুস্তুনতুনিয়া শহরে প্রথম অভিযান হয়েছিল ৩২ হিজরি সনে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু এর নেতৃত্বে। আর এজিদের জন্ম হয়েছে ২৬ হিজরি সনে। অতএব কুস্তুনতুনিয়ার প্রথম অভিযানে এজিদের অন্তুর্ভুক্তি অসম্ভব।

হাফিজ ইবনে কাসির, ইবনুল আসির ইবনুল খালদুন, ইমাম তাবারীসহ সকল মশহুর ঐতিহাসিকগণের বর্ণনা মতে দেখা যায় ৩২ হিজরির পর থেকে ৫০ হিজরি পর্যন্ত প্রায় প্রতি বৎসরেই কুস্তুনতুনিয়া শহরে অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু এর কোনটাতেই পাপিষ্ট এজিদের নাম উল্লেখ নেই। তাহলে আসুন আরো কয়েকটি অভিযান পর্যালোচনা করি


কুস্তুনতুনিয়ায় দ্বিতীয় অভিযান: ৪৩ হিজরি

✦ হাফিজ ইবনে কাসির বেদায়া ওয়ান নেহায়া গ্রন্থে বলেন:

ثم دخلت سنة ثلاث واربعين- فيها غزا بسربن ابى ارطاة بلاد الروم فوغل فيها حتى بلغ مدينة قسطنتنية-

অর্থ: অতঃপর ৪৩ হিজরি শুরু হলো। এই বৎসর বুসর বিন আবি আরতাহ রোম দেশে হামলা করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কুস্তুনতুনিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যান। (বেদায়া ওয়ান নেহায়া ১১/১৫৬ পৃষ্ঠা)

✦ ইবনে খালদুন স্বীয় তারিখ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন:

ودخل المسلمون سنة اثنتين واربعين الى بلاد الروم فهزموهم وقتلوا جماعة من البطارقة ثم دخل بسر بن ارطاة ارضهم سنة ثلاث واربعين ومشى بها وبلغ القسطنتنية-

অর্থ: মুসলমানগণ ৪২ হিজরি সনে রোম দেশে প্রবেশ করেন। তারা সেখানে হামলা করে অনেক সৈন্য হত্যা করেন। অতঃপর ৪৩ হিজরিতে বুসর বিন আরতাহ তাদের ভূমিকে আক্রমণ করেন এবং কুস্তুনতুনিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যান। (তারিখে ইবনে খালদুন ৩য় খন্ড ১১ পৃষ্ঠা)

✦ ইমাম আবু জাফর তাবারী স্বীয় গ্রন্থে বর্ণনা করেন:

ثم دخلت سنة ثلاث واربعين: فمن ذالك غزوة بسر بن ابى ارطاة الروم ومشى بارضهم حتى بلغ القسطنتنية

অর্থ: অতঃপর ৪৩ হিজরি প্রবেশ করল। এই বৎসর বুসর বিন আবি আরতাহ রোমে আক্রমণ করেন। অতঃপর তিনি কুস্তুনতুনিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যান। (তারিখে তাবারী ৫ম খন্ড)


কুস্তুনতুনিয়ায় তৃতীয় হামলা: ৪৪ হিজরি

✦ ইবনুল আসির স্বীয় তারিখ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন:

ثم دخلت سنة اربع واربعين: فى هذه السنة دخل المسلمون مع عبد الرحمن بن خالد بن الوليد بلاد الروم- وغزا بسر بن ابى ارطاة فى البحر-

অর্থ: অতঃপর ৪৪ হিজরি শুরু হল। এই বৎসর মুসলমানগণ আব্দুর রহমান বিন খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে রোম দেশে অভিযান পরিচালনা করেন এবং বুসর বিন আবি আরতাহ সাগর পথে আক্রমণ করেন। (আল কামিল ফিত তারিখ)

হাফিজ ইবনে কাসিরও বেদায়া ওয়ান নেহায়া গ্রন্থে একই রকম বর্ণনা করেছেন।


কুস্তুনতুনিয়া শহরে চতুর্থ অভিযান: ৪৬ হিজরিতে

✦ আল কামিল ফিত তারিখ ও বেদায়া ওয়ান নেহায়া উভয় গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে এভাবে:

ثم دخلت سنة ست واربعين- فى هذه السنة كان مشى مالك بن عبد الله بارض الروم- وقيل بل كان ذالك عبد الرحمن بن خالد بن الوليد-

অর্থ: অতঃপর ৪৬ হিজরি শুরু হল। এই বৎসর মালিক বিন আব্দুল্লাহ রোম সাম্রাজ্যে অভিযান করেন। কেউ কেউ বলেছেন: এই অভিযান হয়েছিল আব্দুর রহমান বিন খালিদ বিন ওয়ালিদের নেতৃত্বে।


আবু দাউদ শরীফের বর্ণনা

আব্দুর রহমান বিন খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর নেতৃত্বে কুস্তুনতুনিয়ায় হামলার বর্ণনা শুধু ইতিহাসের কিতাবেই নয় বরং হাদিসের কিতাবেও এসেছে। দেখুন সিহাহ সিত্তার অন্যতম কিতাব আবু দাউদশরীফে বর্ণনা:

عن اسلم ابى عمران قال غزونا من المدينة نريد القسطنتنية- وعلى الجماعة عبد الرحمن بن خالد بن الوليد- والروم ملصقو ظهورهم بحائط المدينة-

অর্থ: আসলাম আবু ইমরান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: আমরা মদিনা শরীফ থেকে কুস্তুনতুনিয়া অভিমুখে যুদ্ধ যাত্রা করলাম। আমাদের সেনাপতি ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর পুত্র আব্দুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহু। তখন রোমান বাহিনী শহরের দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে যুদ্ধের জন্য দন্ডায়মান ছিল। (আবু দাউদ, কিতাবুল জিহাদ, হাদিস নং ২৫১২)



৪৭ হিজরিতে পুনরায় অভিযান: পঞ্চম অভিযান

✦ ৪৭ হিজরিতে পুনরায় রোমে অভিযান পরিচালিত হয় বেদায়া ওয়ান নেহায়া ও আল কামিল গ্রন্থে একই রকম বর্ণনা এসেছে:

ثم دخلت سنة سبع واربعين- فى هذه السنة كان مشتى مالك بن هبيرة بارض الروم-

অর্থ: অতঃপর ৪৭ হিজরি সন শুরু হল। এই বৎসর মালিক বিন হুবাইরাহ রোম দেশে অভিযান পরিচালনা করেন।

৪৮, ৪৯ হিজরিতে পুনরায় অভিযান: ষষ্ঠ অভিযান

✦ ইবনে খালদুন স্বীয় তারিখ গ্রন্থে বর্ণনা করেন এভাবে:

ثم دخلت سنة ثمان واربعين فشتى عبد الرحمن بانطاكية ايضا ودخل عبد الله بن قيس الفزارى فى تلك السنة بالطائفة وغزاهم مالك بن هبيرة فى البحر وعقبة بن عامر الجهنى فى البحر ايضا باهل مصر واهل المدينة- ثم دخل مالك بن هبيرة سنة تسع واربعين فشتى بارض الروم-

অর্থ: অতঃপর ৪৮ হিজরি শুরু হল। এই বৎসর আব্দুর রহমান ইন্তাকিয়্যাহ প্রবেশ করেন। আব্দুল্লাহ ইবনে কাইস আল ফাযারী এ সময় মালিক বিন হুবায়রাকে সাথে নিয়ে সাগর পথে অভিযান করেন। তখন উকবাহ বিন আমির আল জুহানীও এ অভিযানে ছিলেন। অতঃপর মালিক ইবনে হুবায়রা ৪৯ হিজরি সনে অভিযান পরিচালনা করে রোমে প্রবেশ করেন। (তারিখে ইবনে খালদুন)

সম্মানিত পাঠকবর্গ উল্লেখিত দীর্ঘ আলোচনা থেকে প্রমাণিত হল যে, ৩২ হিজরিতে প্রথম কুস্তুনতুনিয়ার অভিযানে এজিদতো ছিলই না। এমনকি পরবর্তীতে ৪৯ হিজরি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত অভিযানের কোনটাতেই এজিদের অন্তর্ভুক্তির কথা কোন ঐতিহাসিকগণই বলেননি।

কুস্তুনতুনিয়ার যুদ্ধে এজিদের অংশগ্রহণ


কুস্তুনতুনিয়ার যুদ্ধে এজিদের অংশগ্রহণ

সম্মানিত পাঠকবর্গ এখন আমি আলোচনা করব যে এজিদ পরবর্তী একটি অভিযানে কুস্তুনতুনিয়ায় অংশগ্রহণ করেছিল। তাও স্বইচ্ছায় ছিল না। বরং তাকে শাস্তি স্বরূপ জোরপূর্বক সেখানে পাঠানো হয়েছিল। কেউ কেউ বলেছেন ৪৯ হিজরি কারো মতে ৫০ হিজরি অথবা ৫২ হিজরিতে সে একবার অংশ নিয়েছিল। তাহলে আসুন দেখি ঐতিহাসিকগণ কি বলেন?

✦ হাফিজ ইবনে কাসিরের বর্ণনা,

ثم دخل سنة تسع واربعين فيها غزا يزيد بن معاوية بلاد الروم حتى بلغ القسطنتنية-

অর্থ: অতঃপর ৪৯ হিজরি সন শুরু হল। এই বৎসর এজিদ বিন মুয়াবিয়া রোম দেশে অভিযান করে এবং কুস্তুনতুনিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। (বেদায়া ১১/১৮০ পৃষ্ঠা)

✦ হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানীর বর্ণনা,

وكانت غزوة يزيد المذكورة فى سنة اثنتين وخمسين من الهجرة

অর্থ: এজিদের অন্তর্ভুক্তি সম্বন্ধে যে কথা বল হয় তা ছিল ৫২ হিজরির ঘটনা। (ফাতহুল বারি ৬/১২১ পৃষ্ঠা)

✦ আল্লামা বদরুদ্দীন আইনীর বর্ণনা,

وقال صاحب المرئة- والاصح ان يزيد بن معاوية غزا القسطنتنية فى سنة اثنتين وخمسين-

অর্থ: মিরআতের মুসান্নিফের মতে বিশুদ্ধ মত হল, এজিদ বিন মুয়াবিয়া কুস্তুনতুনিয়ার যুদ্ধে শরিক হয়েছিল ৫২ হিজরিতে। (উমদাতুল ক্বারী ১৪/১৯৮ পৃষ্ঠা)

এজিদকে জোরপূর্বক কুস্তুনতুনিয়ায় প্রেরণ

যাই হোক এজিদ একবার কুস্তুনতুনিয়ার অভিযানে শরিক হয়েছিল। কিন্তু তা ছিল শাস্তি স্বরূপ। মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে জোরপুর্বক সেখানে পাঠিয়েছিলেন। আসুন এবার কিতাবের বর্ণনা দেখি।

✦ আল কামিল ফিত তারিখ আল্লামা ইবনুল আসির ‘আল কামিল’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন:

وقيل سنة خمسين سير معاوية جيشا كثيفا الى بلاد الروم للغزاة وجعل عليهم سفيان بن عوف وامر ابنه يزيد بالغزاة معهم- فتثاقل واعتل فامسك عنه ابوه-

فاصاب الناس فى غزاتهم جوع ومرض شديد فانشأ يزيد يقول-

ما ان ابالى بما لاقت جموعهم- يا لغز قذونة من حمى ومن مؤم

اذا اتطأت على الانماط مرتفعا- بدير سمعان عندى ام كلثوم

فبلغ معاوية شعره فاقسم عليه ليحلقن بسفيان الى ارض الروم ليصيبه ما اصاب الناس- فسار ومعه جمع كثير اضافهم اليه ابوه-

অর্থ: কেউ কেউ বলেছেন হিজরি ৫০ সনে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বিরাট একটা বাহিনী রোম দেশে অভিযানের জন্য প্রেরণ করেন। তাদের সেনাপতি ছিলেন সুফিয়ান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু স্বীয় পুত্র এজিদকে তাদের সাথে যুদ্ধে যাবার জন্য নির্দেশ দিলেন। তখন সে ইহাকে অনেক কঠিন মনে করল এবং অসুস্থতার ভান করল। তখন মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বিরত রাখলেন। অতঃপর মুসলিম বাহিনী উক্ত অভিযানে ক্ষুধা ও ভীষণ রোগ ব্যধিতে আক্রান্ত হল। তখন এজিদ একটি কবিতা আবৃত্তি করল:

‘মুসলিম বাহিনী উক্ত অভিযানে যে জ্বর ব্যাধি ও কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে এতে আমার কিছু আসে যায় না। কারণ আমি তো বসে আছি উচ্চ বিছানায়। আমার সাথে আছে উম্মে কুলসুম। এ খবর যখন মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু এর নিকট পৌঁছল তখন তিনি শপথ করলেন যে, এজিদ অবশ্যই রোম দেশে সুফিয়ান বাহিনীর সাথে যোগদান করতে হবে এবং লোকসকল যে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন এজিদও তা ভোগ করতে হবে। অতঃপর সে একটি সম্পুরক বাহিনী নিয়ে সেখানে অংশগ্রহণ করে। (আল কামিল: ৩য় খন্ড ৫৬-৫৭ পৃষ্ঠা)

তারিখে ইবনে খালদুন

ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন স্বীয় তারিখ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন নিম্নরূপ:

ثم بعث معاوية سنة خمسين جيشا كثيفا الى بلاد الروم مع سفيان بن عوف وندب يزيد ابنه معهم- فتثاقل فتركه- ثم بلغ الناس ان الغزاة اصابهم جوع ومرض وبلغ معاوية ان يزيد انشد فى ذالك

ما ان ابالى بما لاقت جموعهم- بالفدفد البيد من حمى ومن شوم

اذا اتطأت على الانماط مرتفعا- بدير مران عندى ام كلثوم

فحلف ليحلقن بهم فسار فى جميع كثير

অর্থ: অতঃপর ৫০ হিজরি সনে মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি বিরাট বাহিনী সুফিয়ান ইবনে আউফের নেতৃত্বে রোম দেশে প্রেরণ করেন। তখন তিনি স্বীয় পুত্র এজিদকে উক্ত বাহিনীর সাথে যাবার জন্য নির্দেশ দিলেন। কিন্তু সে অসুস্থতার ভান ধরল। এবং উক্ত অভিযান থেকে বিরত থাকল। অতঃপর মানুষের নিকট সংবাদ পৌছল যে, উক্ত বাহিনী কঠিন রোগ ব্যধি ও ক্ষুধার সম্মুখীন হয়েছে। অতঃপর মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু এর নিকট সংবাদ পৌঁছল যে, এজিদ নিম্নক্তো কবিতাটি আবৃত্তি করছে:

‘উক্ত বাহিনী যে কঠিন রোগ ব্যাধি ও মুসিবতের সম্মুখীন হয়েছে এতে আমার কিছু যায় আসে না।

আমি তো আমার স্ত্রী উম্মে কুলসুমকে সাথে নিয়ে উচ্চ বিছানায় বসে আছি।’

তখন মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু শপথ করলেন যে, এজিদকে সেখানে অবশ্যই পাঠাবেন। অতঃপর এজিদ একটি বাহিনী নিয়ে সেখানে গমন করে। (তারিখে ইবনে খালদুন ৩য় খন্ড ১২ পৃষ্ঠা)

সম্মানিত পাঠকবর্গ উক্ত আলোচনা থেকে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হলো যে, এজিদ স্বইচ্ছায় শাহাদতের প্রত্যাশায় উজ্জীবিত হয়ে জিহাদের ময়দানে যায়নি। বরং ইহা ছিল তার জন্য কঠিন মুসিবতের বিষয়। সে বাধ্য হয়ে শাস্তিস্বরূপ সেখানে একবার গিয়েছিল। এবার আপনারাই বিচার করুন এ রকম অংশগ্রহণে কি ক্ষমাপ্রাপ্ত হওয়া যায়? জান্নাত ওয়াজিব তো অনেক দূরের কথা।

ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু কি এজিদের অধীন


ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু কি এজিদের অধীনে যুদ্ধে গিয়েছিলেন?

আমি ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি যে, মুয়াজ্জেম হোসেন নামক এজিদী মোল্লা বলেছে ‘৫২ হিজরিতে এজিদের নেতৃত্বে রোমে অভিযান হয়েছিল, এবং ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু তার অধীনে নাকি একজন সৈনিক হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।’ নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক।

ইহা সম্পূর্ণ মিথ্যা আজগুবি ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত বক্তব্য। এ রকম কথা কোন ঐতিহাসিকগণই বর্ণনা করেননি। তবে কেউ কেউ বলেছেন: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহুম এজিদের সাথে ছিলেন। কিন্তু বদরুদ্দীন আইনীসহ অন্যান্য উলামায়ে কেরামগণ সে কথাকেও অস্বীকার করেছেন। দেখুন মূল ইবারতটি:

✦ আল্লামা বদরুদ্দীন আইনীর অভিমত

وذكر ان يزيد بن معاوية غزا بلاد الروم حتى بلغ قسطنتنية ومعه جماعة من سادات الصحابة منهم ابن عمر وابن عباس وابن الزبير وابوايوب الانصارى-

অর্থ: বর্ণিত আছে যে, এজিদ বিন মুয়াবিয়া রোম দেশে অভিযান করে কুস্তুনতুনিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তার সাথে ইবনে উমর, ইবনে আব্বাস, ইবনে জুবাইর ও আবু আইয়ুব আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহুমসহ সাহাবাদের একটি জামাত ছিলেন।

✦ অতঃপর আল্লামা আইনী বলেন:

وقيل سير معاوية جيشا كثيفا مع سفيان بن عوف الى القسطنتنية- فاوغلوا فى بلاد الروم وكان فى ذالك الجيش ابن عباس وابن عمر وابن الزبير وابوا ايوب الانصارى وتوفى ابو ابوب الانصارى فى مدة الحصار-

অর্থ: কেউ কেউ বলেছেন: মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু সুফিয়ান ইবনে আউফের নেতৃত্বে বড় একটি জামাত রোমের কুস্তুনতুনিয়া শহরে প্রেরণ করেন।

উক্ত বাহিনীতে ইবনে আব্বাস ইবনে উমর, ইবনে জুবাইর ও আবু আইয়ুব আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহুমও ছিলেন। এ অভিযানে আবু আইয়ুব আনসারী ইন্তেকাল করেন।

✦ অতঃপর আল্লামা আইনী বলেন:

قلت الاظهر ان هؤلاء السادات من الصحابة كانوا مع سفيان ولم يكونوا مع يزيد بن معاوية لانه لم يكن اهلا ان يكون هؤلاء السادات فى خدمته-

অর্থ: আমি বলব, এ ব্যাপারে বিশুদ্ধ কথা হল এ সমস্ত সম্মানিত সাহাবিগণ সুফিয়ান ইবনে আউফের নেতৃত্বে ছিলেন। তারা এজিদের নেতৃত্বে ছিলেন না। কারণ এ সমস্ত সম্মানিত সাহাবিদের নেতৃত্ব দেওয়ার মত কোন আহল বা যোগ্যতাই এজিদের ছিল না। (উমদাতুল ক্বারী ১৪/১৯৮,১৯৯ পৃষ্ঠা)

✦ ইবনে আসির ও ইবনে খালদুন এর বর্ণনা

আমি ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি যে, ইবুনল আাসির ও ইবনে খালদুন স্ব-স্ব গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু ৫০ হিজরি সনে সুফিয়ান ইবনে আউফের নেতৃত্বে একটি বাহিনী রোম দেশে প্রেরণ করেন। এজিদ সে অভিযানে ইচ্ছা করে যায়নি। পরবর্তীতে তাকে জোরপূর্বক শাস্তিস্বরূপ সেখানে প্রেরণ করা হয়। তখন তার সাথে সম্পুরক হিসেবে আরো কিছু লোক প্রেরণ করা হয়েছিল।

অতএব উক্ত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হল যে, ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু দূরের কথা অন্যান্য কোন বুজুর্গ সাহাবিও এজিদের নেতৃত্বে কুস্তুনতুনিয়ায় গমন করেননি।

ইবনে কাসিরের একটি বক্তব্য ও জবাব


ইবনে কাসিরের একটি বক্তব্য ও জবাব

✦ হাফিজ ইবনে কাসির স্বীয় বেদায়া ওয়ান নেহায়া গ্রন্থে ১১তম খন্ডের ১৮০ পৃষ্ঠায় এজিদ সম্বন্ধে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন যা অসামাঞ্জস্যপূর্ণ ও স্ববিরোধী বক্তব্য। আসুন আমরা প্রথমে তাঁর বক্তব্যটি দেখি:

ثم دخلت سنة تسع واربعين- فيها غزا يزيد بن معاوية بلاد الروم حتى بلغ القسطنتنية ومعه جماعة من سادات الصحابة منهم ابن عمر وابن عباس وابن الزبير وابو ابوب الانصارى

وقد ثبت فى صحيح البخارى ان رسول الله صلى الله عليه وسلم قال اول جيش يغزون مدينة قيصر مغفورلهم فكان هذا الجيش اول من غزاها-

অর্থ: অতঃপর ৪৯ হিজরি সন শুরু হল। এ বৎসর এজিদ বিন মুয়াবিয়া রোম দেশে আক্রমণ করেন। শেষ পর্যন্ত সে কুস্তুনতুনিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তার সাথে সাহাবাদের একটি জামাত ছিল। তাদের মধ্যে ইবনে উমর, ইবনে আব্বাস, ইবনে জুবাইর ও আবু আইয়ুব আনসারী অন্যতম।

সহিহ বুখারীশরীফে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলছেন: প্রথম বাহিনী যারা কায়সারের শহরে আক্রমণ করবে তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত। আর উক্ত বাহিনীই হল প্রথম বাহিনী যারা সে শহরে অভিযান করেছিল।

সম্মানিত পাঠকবর্গ হাফিজ ইবনে কাসিরের উক্ত বক্তব্যটি অসামাঞ্জস্যপূর্ণ ও স্ববিরোধী। কারণ এখানে তিনি বলছেন এই ৪৯ হিজরির অভিযানই হচ্ছে প্রথম বাহিনী যারা কুস্তুনতুনিয়ায় আক্রমণ করেছে। অথচ তিনি নিজেই একই কিতাবে প্রথমে বর্ণনা করেছেন যে ৩২ হিজরিতেই সর্বপ্রথম কুস্তুনতুনিয়া শহরে অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। ইতোপূর্বে আমি এ ব্যাপারে অন্যান্য ঐতিহাসিকদের বর্ণনাও পেশ করেছি। এখন শুধু ইবনে কাসিরের বর্ণনাটুকু আবার দেখুন।

ثم دخلت سنة ثنتين وثلاثين- وفيها غزا معاوية بلاد الروم حتى بلغ المضيق مضيق القسطنتنية ومعه زوجته عاتكه-

অর্থ: অতঃপর ৩২ হিজরি শুরু হলো। এই বৎসর মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু রোম দেশে অভিযান পরিচালনা করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি কুস্তুনতুনিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যান। (প্রাগুক্ত)

তাছাড়া ৩২ হিজরীর পরে ৫০ হিজরি পর্যন্ত প্রায় প্রতি বৎসরেই কুস্তুনতুনিয়ায় হামলা হয়েছে। অতএব ৪৯ হিজরিতে পরিচালিত অভিযান প্রথম অভিযান হল কিভাবে?

এজিদের ক্ষমাপ্রাপ্তির ব্যাপারে আল্লামা আইনীর বক্তব্য


এজিদের ক্ষমাপ্রাপ্তির ব্যাপারে আল্লামা আইনীর বক্তব্য

আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী, উমদাতুল ক্বারী গ্রন্থে বলেছেন: ‘মহাল্লাব’ নামক জনৈক ব্যক্তি বলেছেন বুখারী শরীফে বর্ণিত হাদিসে এজিদের প্রশংসা রয়েছে, কারণ সে কায়সারের শহরের প্রথম অভিযানে অংশগ্রহণ করেছে।’

✦ এর জবাবে আল্লামা আইনী বলেন:

قلت اى منقة كانت ليزيد وحاله مشهور

অর্থ: আমি বলব: এখানে এজিদের কি প্রশংসা রয়েছে? অথচ তার হাল হাকিকত মশহুর বা সুষ্পষ্ট।

অতঃপর আইনী বলেন:

فان قلت قال صلى الله عليه وسلم فى حق هذا الجيش مغفور لهم-

قلتথ قيل لا يلزم من دخوله فى ذالك العموم ان لايخرج بدليل خاص- اذ لا يختلف اهل العلم ان قوله صلى الله عليه وسلم مغفورلهم مشروط بان يكونوا من اهل المغفرة- حتى لو ارتد واحد ممن غزاها بعد ذالك لم يدخل فى ذالك العموم اتفاقا فدل على ان المراد مغفور لهم لمن وجد شرط المغفرة فيه منهم

অর্থ: আপনি যদি বলেন: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তো উক্ত বাহিনী সম্বন্ধেই বলেছেন: ‘তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত’। তাহলে আমি বলব: উক্ত সুসংবাদ অন্তর্ভুক্তি হওয়াটা আমভাবে আবশ্যকীয় নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত কোন খাস দলিল পাওয়া না যাবে। কারণ এ ব্যাপারে আহলে ইলম বা তথা উলামায়ে কেরামদের মধ্যে কোন মতানৈক্য নেই যে, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর কথাটি শর্তযুক্ত তা হল ক্ষমাপ্রাপ্ত তারাই হবে যারা ক্ষমা পাবার যোগ্য আহল। অতএব কোন ব্যক্তি অভিযানে অংশ নেয়ার পরেও যদি মুর্তাদ হয়ে যায় তাহলে উক্ত সুসংবাদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।

অতএব ইহাই প্রমাণিত হলো যে ‘ক্ষমাপ্রাপ্ত’ কথা দ্বারা মুরাদ হল ঐ সমস্ত ব্যক্তিবর্গ যাদের মধ্যে ক্ষমা প্রাপ্তির শর্ত পাওয়া যাবে। (উমদাতুল ক্বারী, কিতাবুল জিহাদ ১৪/২৭৬৬) (ফতহুল বারি কিতাবুল জিহাদ)

শেষ কথা


শেষ কথা

পরিশেষে বলতে চাই, ব্যক্তিগতভাবে কারো সাথে আমাদের কোন শত্রুতা নাই। আমরা শান্তি প্রিয় মুসলমান। শান্তি প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য। তাই আমাদের মাযহাবের ইমাম, ইমাম আ’জম আবু হানিফা রাদিয়াল্লাহু আনহুও এজিদের ব্যাপারে নিরবতাই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তাই বলে ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু এর শানে বেয়াদবি ও নির্লজ্জভাবে এজিদের প্রশংসা কোন নবী প্রেমিক মুসলমান কখনো মেনে নিতে পারে না। অতএব এ সমস্ত বাতিল মতবাদের বিরুদ্ধে আমাদের কলম চলবে অবিরাম গতিতে ইংশাআল্লাহ।

তথ্যসূত্র


তথ্যসূত্র

১. বুখারিশরীফ। ইমাম বুখারি। ওফাত ২৫৬ হিজরি।

২. আবুদাউদ শরীফ। ইমাম আবু দাউদ। ওফাত ২৭৫ হিজরি।

৩. ফাতহুল বারী। ইবনে হাজার আসকালানী। ওফাত ৮৫২ হিজরি।

৪. উমদাতুল ক্বারী। আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী। ওফাত ৮৫৫ হিজরি।

৫. তারিখুল খোলাফা। ইমাম জালালউদ্দিন সুয়ুতি। ওফাত ৯১১ হিজরি।

৬. আল কামিল ফিত তারিখ। ইবনুল আসির। ওফাত ৬৩০ হিজরি।

৭. তারিখুল ইসলাম। ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবী। ওফাত ৭৪৮ হিজরি।

৮. আল বেদায়া ওয়াল নেহায়া। হাফিজ ইবনে কাসির। ওফাত ৭৭৪ হিজরি।

৯. তারিখে তাবারী। আবু জাফর মুহাম্মদ আত তাবারী। ওফাত ৩১০ হিজরি।

১০. তারিখে ইবনে খালদুন। ইবনে খালদুন। ওফাত ৮০৮ হিজরি।


YouTube এ সকল অ্যাসাইনমেন্টের সমধান পেতে আমাদের অফিসিয়াল YouTube চ্যানেলটিতে এখনি সাবস্ক্রাইব করো।
আমাদের চ্যানেলঃ 10 Minute Madrasah

প্রশ্ন প্রকাশ হলে সবগুলো বিষয়ের উত্তর দেওয়া হবে। তাই তোমরা পেজটি সেভ বা বুকমার্ক  করে রাখো।

আপডেট পাওয়ার জন্য আমাদের ফেসবুক পেইজে যুক্ত থাকো

আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে সাথে থাকুন।

Join Our Facebook Group

This post was last modified on August 22, 2020 10:28 pm

Recent Posts

অষ্টম (৮ম) শ্রেণি হোম সাইন্স তৃতীয় সপ্তাহের এ্যাসাইনমেন্ট ২০২১ এর সমাধান

অষ্টম (৮ম) শ্রেণি হোম সাইন্স তৃতীয় সপ্তাহের এ্যাসাইনমেন্ট ২০২১ এর সমাধান আমার সারাদিনের কর্মকাণ্ডের একটি… Read More

1 month ago

নবম (৯ম) শ্রেণি অর্থনীতি তৃতীয় সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট ২০২১ এর সমাধান

নবম (৯ম) শ্রেণি অর্থনীতি তৃতীয় সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট ২০২১ এর সমাধান Class 9 Economics 3rd Week… Read More

1 month ago

নবম শ্রেণি (৯ম) শ্রেণি গনিত তৃতীয় সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট ২০২১ এর সমাধান

নবম শ্রেণি (৯ম) শ্রেণি গনিত তৃতীয় সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট ২০২১ এর সমাধান নবম শ্রেণি (৯ম) শ্রেণি… Read More

1 month ago

নবম (৯ম) শ্রেণি উচ্চতর গনিত তৃতীয় সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট ২০২১ এর সমাধান

নবম শ্রেণি উচ্চতর গনিত (৯ম) শ্রেণি অ্যাসাইনমেন্ট ২০২১ (৩য় সপ্তাহ) এর সমাধান নবম (৯ম) শ্রেণি… Read More

1 month ago

১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সময়কালে মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধুর অবদান | ২য় সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট ২০২১ এর সমাধান

১৯৫২ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সময়কালে মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধুর অবদান ২য় সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্ট ২০২১ এর… Read More

1 month ago

অ্যাসাইনমেন্ট ২০২১ (Assignment 2021) এর সমাধান

দশম সপ্তাহ (10th Week) নবম সপ্তাহ (9th Week) অষ্টম সপ্তাহ (8th Week) সপ্তম সপ্তাহ (7th… Read More

1 month ago