সাহাবীর মর্যাদা সুরক্ষা আইন – এ কে ফজলুল হক

0
1273
সাহাবীর মর্যাদা সুরক্ষা আইন - এ কে ফজলুল হক
সাহাবীর মর্যাদা সুরক্ষা আইন - এ কে ফজলুল হক
Print Friendly, PDF & Email

সাহাবীর মর্যাদা সুরক্ষা আইন – এ কে ফজলুল হক

কোন একজনকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী মেনে নেয়ার সাথে সাথে কোরআন এবং হাদিসের আলোকে তার মর্যাদা মেনে নেয়া ও মর্যাদার দাবি পূরণ অপরিহার্য হয়ে যায়। সেই মর্যাদার কথা পবিত্র কোরআনে এসেছে, সবিস্তারে এসেছে পবিত্র হাদিসে।

কোরআন বলেছে, “মহান আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট”। বুখারীসহ অনেক কিতাবেই আছে, “লা তাসুব্বু আসহাবী- তোমরা আমার সাহাবীদের মন্দ বলো না”। তিরমিজীতে আছে, “আমার পরে তোমরা আমার সাহাবীদের সমালোচনার টার্গেট বানিও না”। নাসায়ীতে আছে, “আমার সাহাবীদের সম্মান করো”। তাবরানী বর্ণনা করেছেন, “আমার সাহাবীদের আলোচনা আসলে (কথায় ও কাজে) সংযত থাকিও”। এহেন অসংখ্য হাদিসে আমাদের করণীয় আলোচনা করা হয়েছে। এগুলো আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

সুতরাং যে ব্যক্তি কাউকে সাহাবী মেনে নেবে, সাথে সাথে তার সমালোচনা করা থেকে দুরে থাকা ঐ ব্যক্তির দায়িত্ব হয়ে যায়। কাউকে সাহাবী মেনে নেয়া আর তার সমালোচনা করা সাংঘর্ষিক আচরণ। 
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতৃক তার সাহাবীদের সমালোচনা নিষেধ করার মধ্যে সুক্ষ্ম ইঙ্গিত আছে একথার প্রতি যে, ওখানে সমালোচনা করার মত বিষয়বস্তু থাকতে পারে। সমালোচনার বিষয় না থাকলে তো আর নিষেধ করারই প্রয়োজন নেই। নিষেধ করার মধ্যেই সুক্ষ্ম ইশারা আছে যে, সাহাবীদের সমালোচনা করার মত রসদ কেউ খুঁজলে পেতেও পারেন। ঢের পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু করা যাবে না। এটা নিষিদ্ধ,  ‘প্রটেক্টেড বাই ল’  তথা আইন দ্বারা সুরক্ষিত। একে ‘সাহাবীর মর্যাদা সুরক্ষা আইন’ বলতে পারেন। মুসলমান মাত্রই সে আইন মেনে চলতে বাধ্য।


 যারা ‘মকবুল সাহাবী’ বলে নতুন পরিভাষা আবিষ্কার করেছে, যা পূর্বযুগের নির্ভরযোগ্য কোন আলেমগণ বলেননি, তা সাহাবীদের সমালোচনার একটা ‘গোপন দরজা’ বলেই মনে হয়- যে দরজায় আবু বকর সিদ্দিক রা. এর মত সাহাবীকেও গাইরে মকবুল ‘তকমা’ লাগানো হতে পারে। এটা একটা দুষ্টু পরিভাষা, যা অপরিহার্যভাবে পরিত্যাজ্য।


 এক ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়ার পরও একজন সাহাবী তাকে হত্যা করেছিল এই ভেবে যে,  সে জীবন বাঁচানোর জন্যই তা পড়েছে- মন থেকে নয়। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ সাহাবীকে তিরস্কার করে বললেন,  তুমি কি তার ক্বালব ফেড়ে দেখেছো?  এখন ঐ সাহাবীকে আমরা হত্যাকারী হিসেবে ‘খুনি’ বলতে পারব না। অথচ তাঁর হাতে একজন খুন হয়েছে। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম একজন কিবতিকে এবং হযরত খিজির আলাইহিস সালাম একটা শিশুকে মেরে ফেলেছিলেন বলে পবিত্র কোরআনে আছে। তা সত্ত্বেও আমরা তাঁদেরকে ‘খুনি’ বলতে পারব না। অথচ সেখানে খুনের ঘটনা ঘটেছে। এরকম অনেক ঘটনার কথাই ইতিহাসে আছে। ইতিহাস তার সাক্ষী হয়ে আছে।

সাহাবী যুগে যেমন হয়েছে, তাবেঈ কিংবা তাবে তাবেঈ যুগেও হয়েছে। তাবেঈ যুগ ও পরবর্তী যুগের ঘটনাবলীর ন্যায়-অন্যায় বিশ্লেষণ করে একজনকে দোষী এবং অন্যজনকে নির্দোষ বলার ক্ষেত্রে আমরা যতটা স্বাধীন, সাহাবীদের ক্ষেত্রে উপরোক্ত নিষেধাজ্ঞার কারণে মোটেই স্বাধীন নই। যেমনটি মুসা ও খিজির আলাইহিমাস সালামের ক্ষেত্রে। কারণ কোরআন ও হাদিসের নীতিমালায় আমাদের অকাট্য বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে, নবীদের সমালোচনা করা যাবে না। একইভাবে তৈরি হয়েছে সাহাবীদের বেলায়ও। 


সুতরাং যেভাবে খুনের ঘটনা ঘটার পরও আমরা হযরত মুসা ও খিজির আলাইহিমাস সালামকে ‘খুনি’  কিংবা অন্যকোন শব্দ দিয়ে সমালোচনা করতে পারি না,  পারব না- ঐ বিশ্বাস আমাকে তা করার অনুমতি দিবে না। বরং ওগুলোকে এমনভাবে আমাদের ব্যাখ্যা করতে হয়, যেভাবে ব্যাখ্যা করলে তাঁদের প্রতি সম্মানজনক হয়। তাফসির গ্রন্থগুলোতে সে ব্যাখ্যাই করা আছে। অনুরূপভাবে ঘাত-সংঘাত,  প্রতিদ্বন্দ্বিতা-প্রতিযোগিতা, যুদ্ধ-বিগ্রহ অনেক কিছুই ঘটেছে সাহাবী যুগে। এগুলোর দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এগুলোর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ করে কাউকে দোষী এবং কাউকে নির্দোষ সাব্যস্ত করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। কিন্তু তা করতে আমরা স্বাধীন নই। কারণ ওনারা সাহাবী। তাঁদের মর্যাদা ‘ইসলামী আইন দ্বারা সুরক্ষিত’।
 যে আলোচনা তাঁদের জন্য সম্মানজনক,  আমরা শুধু সে আলোচনা করার জন্যই অনুমতিপ্রাপ্ত।  উপরে নাসায়ী শরীফের হাদিসটি আবার লক্ষ্য করুন। আর যা বললে তাঁদের জন্য অসম্মানজনক হবে সেক্ষেত্রে হয় আমাদের ‘কাফফে লিসান’ করতে হবে, যেমনটি ‘কাফফে লিসান’ করার কথা বলেছেন হযরত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রহ.। অন্যথায় এমন ব্যাখ্যা করতে হবে যা তাদের জন্য সম্মানজনক। 
সালফে সালেহীন এই প্রচেষ্টাই করেছেন। কেয়ামত পর্যন্ত অনাগত মানুষ যাতে সকল সাহাবীদের ব্যাপারে শ্রদ্ধা ও সম্মান অটুট রাখতে পারে,  সে প্রয়োজনেই সালফে সালেহীনগণ হযরত আমিরে মুয়াবিয়াসহ অন্যান্য সাহাবায়ে কিরামের বাহ্যিক দৃষ্টিতে অন্যাহ্য মনে হয় এমন কর্মগুলোর বিভিন্ন ব্যাখ্যা করেছেন। কেউ বলেছেন ইজতেহাদী ভুল, কেউ বিরত থেকেছেন। এসকল ব্যাখ্যা মূলতঃ সাহাবীদের সমালোচনা নিষিদ্ধ- এ মৌলিক অবস্থান থেকেই। এ ব্যাখ্যাগুলো সাহাবীদের সমালোচনা থেকে রক্ষা পাওয়ার একটা বড় রাস্তা তৈরী করেছে আমাদের জন্য। 
সুরা আম্বিয়ার ৭৮ ও ৭৯ নং আয়াতে বর্ণিত ঘটনার বিষয়ে হযরত সোলায়মান ও দাউদ আ.এর রায় বা সিদ্ধান্তে যেমনটি কোরআনের ইঙ্গিত। ওখানেও হযরত সোলায়মান আ. এর সিদ্ধান্ত সঠিক বলা হয়েছে। কিন্তু দাউদ আ.কে তার বিপরীত সিদ্ধান্ত দেয়ার কারণে দায়ী করা হয় নি। সালফে সালেহীনের এই ব্যাখ্যা যদি কারো পছন্দ না হয়,  তাহলে বিকল্প ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তবেঁ তা যেন কোনভাবেই কোন সাহাবীর জন্য অসম্মানজনক না হয়। পবিত্র কোরআনের সুরা ফাতিহা ও সুরা নিসার ৫৯  নং আয়াতে ইঙ্গিতবহ তাফসীরের আলোকে সালফে সালেহীনের ব্যাখ্যার উপর সন্তুষ্ট থাকাই আমাদের জন্য নিরাপদ।  
 আর ব্যাখ্যা করার বিষয়টির যুতসই উদাহরণ বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম নবভীর ঐ বক্তব্য,  যা তিনি হযরত আমিরে মুয়াবিয়া রা. এর বক্তব্যের ক্ষেত্রে বলেছেন। হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাসকে হযরত আমিরে মুয়াবিয়া রা. বলেছিলেন,  “ হে সাদ,  হযরত আলী রা. কে গালমন্দ করতে কোন জিনিস তোমাকে বাঁধা দিচ্ছে”। সাধারণভাবে বুঝা যায়,  হযরত আলী রা. কে কেন গালমন্দ করে না, হযরত সাদ থেকে তার কৈফিয়ত তলব করেছেন আমিরে মুয়াবিয়া রা.। কিন্তু না। ইমাম নবভী এমনভাবে ব্যাখ্যা করলেন, যেভাবে করলে আমিরে মুয়াবিয়া রা. এর সম্মান রক্ষা করা হয়।
 এটাই একজন ওয়াফাদার উম্মতের দায়িত্ব। এই ওয়াফাদারী সালফে সালেহীনের মধ্যে করেননি কে? ইমাম আহমদ, শাফেয়ী, ইবনে মোবারক, শাবী, ইবনে হাজার, নবভী, সুয়ুতী, যাহাবী, আলা হযরতসহ প্রায় সকলেই করেছেন। তাঁরাই তো আমাদের মুক্তাদা। ঐ ইতিহাসগুলোর প্রণেতা। তাঁরাই সব বিশ্লেষণ করে আমাদেরকে সতর্ক করেছেন। সমালোচনা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। বর্তমান নতুন কারো নতুন ব্যাখ্যা গ্রহণ করে সাহাবীদের সমালোচনার দরজা উন্মুক্ত করে দেয়া আমাদের ইমানের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সাহাবীদের আলোচনা হবে সম্মানের, সমালোচনার নয়। আর সিফফিন ও জামালসহ তৎকালীন বিরোধপূর্ণ ঘটনাগুলো এতটাই জটিল, এতটাই কঠিন, এতটাই সুক্ষ্ম, এতটাই বিস্তৃত যে এটা কখনো সাধারণের সিলেবাস নয়। মনে রাখতে হবে, ঐ ইতিহাসগুলো তলাহীন মহাসাগরের মত।
তাহলে কি ঐ সকল ঘটনাবলীর আলোচনাই করা যাবে না?  যদি তাই হয় তাহলে ইতিহাসবিদগণ তাদের ইতিহাসগ্রন্থে তা আলোচনা করলেন কেন? এ প্রশ্ন হতেই পারে।
ইতিহাস ইতিহাসই। ইতিহাস দিয়ে সবসময় আকীদা তৈরি বা পরিচালিত হয় না। আকীদার উৎস পবিত্র কোরআন ও হাদিস। ইতিহাস প্রতিটি ঘটনার চিত্র ধারণ করে রাখে। এটাই ইতিহাসের কর্তব্য। এসকল ক্ষেত্রে রেফারেন্স কোড করে প্রয়োজনে সে ইতিহাস উল্লেখ করা হয়ত যাবে। তবেঁ প্রতিষ্ঠিত আকীদা বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক তথ্য আসলে আকীদার পক্ষে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে নিজের অবস্থান তুলে ধরা কর্তব্য। সে কারণেই ইবনে কাসির,  তাবারী,  ইবনে আদী,  সুয়ুতী,  যাহাবীসহ প্রা্য় সকলেই এরকম ঘটনাবলী আলোচনা করে সেখানে কিংবা অন্যস্থানে সাহাবীদের সমালোচনা না করার জন্য সতর্ক করেছেন। আলোচনা করেছেন  শুধু ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণের জন্যই করেছেন- সমালোচনার স্টাইলে নয়। 
ধরুন, কারো বাবা আর সন্তান ঝগড়া করেছে। মারামারি হয়েছে। বাবার হাতে সন্তান খুন হয়েছে। এটুকু ইতিহাসের উপজীব্য। এ ক্ষেত্রে আপনার অবস্হান নির্রারিত হবে নৈতিকতায়। ইতিহাসকে ঐতিহাসিক কিংবা ইতিহাসগ্রন্থের রেফারেন্স দিয়ে উপস্থাপন করাতে তেমন অপরাধ দেখছি না। কিন্তু ইমানের সাথে সাংঘর্ষিক ঐতিহাসিক তথ্যকে নিজের মত হিসেবে উল্লেখ করার মধ্যে নিশ্চয়ই সমস্যা আছে। আবার ইতিহাসের তথ্য উপস্হাপনের ক্ষেত্রে যা মূলতঃ সমালোচনামূলক নয় এমন শব্দ বা বিষয়কে সমালোচনা আখ্যা দিয়ে তর্কের জন্ম দেয়ার প্রবণতাও অহেতুক উত্তাপ ছড়াতে সহায়তা করে।
 তবেঁ ফেবু ওয়ালের কাঁচা বয়সের পাঠকদের কাছে সাহাবীদের রক্তাক্ত ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়োজন আছে কিনা বা তুলে ধরলে কিভাবে বা কোন উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হবে তা যথেষ্ট সুক্ষ্মতার সাথে বিবেচনার দাবি রাখে। মেরাজের ঘটনা শুনে হযরত আবু বকর রা. কি বলেছেন তা সকলেরই জানা। কিন্তু তার বিপরীতে কিছু নতুন মুসলমান মেরাজের ঘটনা শুনে বিশ্বাস করতে না পেরে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। উচ্চাঙ্গের ঐতিহাসিক তথ্যগুলো বিশেষজ্ঞদের টেবিলেই থাকুক না। ফিকহ শেখা যেমন সকলের হিসসা নয়- বরং কিছু মানুষের। তাবরানীর মুজামে কাবিরের বর্ণিত হাদিসে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নির্দেশ বর্ণিত হয়েছে- ‘ইজা জুকিরা আসহাবী ফা-আমছিকো’। এই হাদিসটি উল্লেখ করে ইমাম সুয়ুতী তার তারিখুল খুলাফা কিতাবে ইবনে সা’দের প্রশংসা করেছেন, কারণ ইবনে সা’দ তার গ্রন্থে হযরত আলী রা. এর আমলের ঘটনাগুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করেছেন। ইমাম সুয়ুতী এও বলেছেন, এ সকল ক্ষেত্রে এমনটি করা উচিত। আমিও তাই মনে করি।
 ইতিহাস দিয়ে সমালোচনা করতে চাইলে হযরত মুসা ও খিজির আ.সহ নবী-রাসুল প্রায় সকলকেই সমালোচনা করা যাবে। কারণ এমনিতেই যারা সমালোচনা করে নিজের নফসের খাবার সংগ্রহ করেন, সমালোচনা করতে ঐ সকল লোকদের কোন যৌক্তিক ইস্যুর প্রয়োজন হয় না। কিন্তু ইতিহাসকে আকীদার উপর খবরদারি করতে দেয়া মোটেই নিরাপদ নয়। যে ইতিহাসগ্রন্থগুলোর তথ্য ইদানীং ফেবুওয়ালে ঝড় তুলেছে, ঐ ইতিহাসগ্রন্থগুলোর লেখকগণও আকীদাগতভাবে সাহাবীদের সমালোচনা থেকে যোজন যোজন দূরে। এগুলো আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। যারা প্রয়োজন ও ক্ষেত্র বিবেচনা না করেই নতুন প্রজন্মকে পুরাতন ‘সত্য ইতিহাস’ শেখানোর নামে জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধের মত জটিল ঘটনাগুলোর গভীর বিশ্লেষণ ও সাহাবীদের পারস্পরিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ সাধারণের কাছে উপস্হাপন করতে চান  তারা অবিবেচক শিক্ষিত। সবার জন্য সিলেবাস সমান নয়। সরলপ্রাণ মুসলমানদের যুদ্ধবিগ্রহে ঐ জটিল সিলেবাস শেখাতে গেলে চরম বদহজমি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রকে এম.এ. ক্লাসের সিলেবাস দেয়া অবিবেচকই তো! মানুষের মেধা বিবেচনা করে তার সাথে কথা বলাই ধর্মীয় ও সামাজিক নীতি। যারা বলে, “সত্য প্রকাশে নিরব থাকলে বোবা শয়তান হতে হয়”। এরা এক হাদিসের হাফেজ! হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন,  প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আমি ইলমের দুটি পাত্র ধারণ করে আছি। যার একটি আমি প্রকাশ করি। অন্যটি প্রকাশ করলে আমার শিরশ্ছেদ করা হতে পারে। হাদিসের অর্থ ও প্রয়োগক্ষেত্র সম্পর্কে পরিপূর্ণভাবে জ্ঞান না রেখে হাদিস দিয়ে ফতোয়া দেয়া অপরাধ। সব সত্য সবসময় সবার কাঁছে প্রকাশযোগ্য হয় না।‘লা তাসুব্বু আসহাবী’ হাদীস কোড করে যারা বলে, এখানে ‘গালমন্দ’ করাকে নিষেধ করা হয়েছে- সমালোচনা তো নিষেধ করা হয় নি। ওনারা আরবি (السب) শব্দটির প্রায়োগিক অর্থ এবং এর সাথে (الشتم) এর পার্থক্য ভালো করে রপ্ত করেননি। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের সকলেই প্রায় একমত যে, জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধে ‘হক’ ছিলো হযরত আলী রা. এর পক্ষে। ইতিহাস ও যুক্তির আলোকে তার বিপরীত পক্ষকে ‘বাতিল’ বা অন্যকিছু বলার সুযোগ আছে। কিন্তু ঐ যে ‘শরয়ী’ আইনের বাধ্যবাধকতায় আমরা আবদ্ধ। তবেঁ আম্মার রা. এর হাদিসের বর্ণিত (باغية) তথা বিদ্রোহী শব্দটি ব্যাখ্যা সাপেক্ষে বলা যাবে বলে কেউ কেউ বলেছেন। হযরত আম্মার রা. এর হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা না বুঝে যারা সাহাবাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ-বিগ্রহকে কুফরি বা মুনাফেকি বলে তাদেরকে সুরা হুজুরাতের ৯ নং আয়াতে দৃষ্টি দেয়ার জন্য অনুরোধ করছি। 
আর ঐতিহাসিক তথ্য ঘেটে সমালোচনা করতে চাইলে পক্ষ-বিপক্ষের কাছে কেউই বাদ যাবে বলে মনে হয় না। না সাহাবায়ে কিরাম,  না আহলে বাইতে আতহার। দ্বিপক্ষীয় সমালোচনার ঐ অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য মওলা আলী শেরে খোদা রা. ও আমিরে মুয়াবিয়া রা. এর শানে আপন-আপন ঘরানার অসাধু লোকেরা অনেক জাল হাদিস তৈরি করেছে বলে আলা হযরত উল্লেখ করেছেন। যদিও তাঁদের কেউই জাল হাদিস নির্ভর মর্যাদার মুখাপেক্ষী নন। কোন একজনের বানাওয়াট শান বর্ণণায় অন্যজনের সম্মানহানীরও আশংকা থাকে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী হওয়াটাই তো ওনাদের বড় পরিচয়। যদিও মর্যাদার ভিন্নতা আছে। আহলে বাইতের মর্যাদা তো এককথায় অনন্য। আহলে বাইত, বিশেষতঃ হযরত আলী রা. এর সাথে আমীরে মুয়াবিয়া রা. এর তুলনা হয়না। সে কারণে হযরত আলী রা. এর জীবনী পাঠ করা যতটা সুখকর ও আনন্দময়, আমিরে মুয়াবিয়া রা. এর জীবনী পাঠ করা সবার জন্য অতটা মসৃণ নাও হতে পারে। সে কারণেই আবারও বলি, ইতিহাসের ঐ পাঠ সবার সিলেবাস নয়। 
আবার শুধু সাহাবী বা আহলে বাইতের ক্ষেত্রেই নয়, যেকোন বিষয়ে বলা বা লেখার ক্ষেত্রে আমাদেরও ভুল হওয়া অস্বভাবিক নয়। আমাদের সম্মাণিত আকাবেরদের কখার সাথে আপনার কোন বিষয়ে দ্বিমতও থাকতে পারে। আমাদের নিকঠ অতীতের আকাবেরদের অনেক পরিশ্রমের ফসল আমাদের আজকের এই সুন্নিয়ত। অনেকভাবেই আমরা তাঁদের কাছে ঋণী। এ কারণে তাদের প্রতি আমাদের অনেক শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা। তাঁদের কথা ও লেখায়ও ভুল কিছু প্রতিভাত হতে পারে। যেমন, নামাযে কাতার সোজা করা হানাফী মাজহাবে সুন্নত। অথচ আমাদের একজন মুরুব্বীর বইতে ওয়াজিব লেখা। তবে সে তথ্যগুলো উপস্হাপন করার বা দ্বিমত পোষণ করারও তো তরিকা বা সলিকা আছে, জায়গা আছে। হুলুস্থুল তৈরী করা দ্বায়িত্বশীল ব্যাক্তিদের মানায় না। আমাদের আকাবের আর বাতিল ঘরানার মুরুব্বীদের তথ্য উপস্হাপনের পদ্ধতিগত পার্থক্য ভুলে গেলে চলবে না। এ ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কি?  হযরত আমিরে মুয়াবিয়া রা. কে সাহাবী স্বীকারকারীগণ যাতে আহলে বাইতের ভালোবাসাকে শিয়া ইজম কিংবা অন্যকোন খারাপ ভাষায় অভিযুক্ত না করে। হযরত আমিরে মুয়াবিয়া রা.কে সাহাবী স্বীকৃতি দেয়া কাউকে শিয়া বলা অনেকটা কঠিন- যদি তিনি তাঁর সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকেন। কারণ,  শিয়ারা সাধারণতঃ সাহাবীদের সমালোচনা শুরু করে হযরত আমীরে মুয়াবিয়া রা. এর সমালোচনার মাধ্যমে। কাউকে রাফেজী বলা অতীত যুগে মুলা তরকারীর মতই সস্তা ছিল। আশ্চর্য হলেও সত্য যে,  হযরত ইমাম শাফেয়ীসহ অনেক মুজতাহিদ ইমাম এবং অসংখ্য মুহাদ্দেসীনের বিরুদ্ধে শিয়া (রাফেজী) অপবাদ দেয়া হয়েছিল। কাউকে আহলে বাইতের মহব্বতের কারণে,  কাউকে আবার হযরত আমিরে মুয়াবিয়া রা. এর অমূলক শান বর্ণনা না করার কারণে। শুধু অপবাদই নয়- ইমাম নাসায়ীসহ অনেককেই আবার নির্যাতনও করা হয়েছিল। উমাউয়া শাসনের অধিকাংশ সময় আসলেই আহলে বাইতের প্রেমকিদের জন্য অনেক কঠিনই ছিল। আর মাওলা আলী রা. এর শত্রু বেশী হবে তা তো প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। অথচ পবিত্র কোরআন ও অথেন্টিক হাদিসের আলোকে আহলে বাইতের প্রতি অকৃপণ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা একজন ইমানদারের দুনিয়া ও আখেরাতে নাজাতের জন্য অলঙ্ঘনীয় কর্তব্য। জামাল ও সিফফিনের যুদ্ধসহ দ্বিপাক্ষিক সংঘাতময় বিষয়গুলোতে ঐতিহাসিকভাবে যাদের উপর অভিযোগের দায় বর্তানোর সুযোগ আছে,  আমাদের দায়িত্ব হল সাহাবী হিসেবে ঐসকল বিষয়ে তাঁদের সমালোচনা না করে ‘কাফফে লিসান’ করা ও তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা। আর আহলে বাইতের প্রতি নিজের প্রেম-ভালোবাসার পুরোটা নিংড়ে দেয়া। তবে এ প্রেম যাতে আবার অন্য কোন সাহাবীকে অশ্রদ্ধা করতে প্রলুব্ধ না করে।

Your 250x250 Banner Code