জামায়াতত্যাগীরা ‘মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গিকার’ বাস্তবায়ন করতে চান

0
14
Print Friendly, PDF & Email

‘মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গিকার’ বাস্তবায়ন করতে চান যুদ্ধাপারাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী থেকে বের হয়ে ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’ (এবি পার্টি) নামে আত্মপ্রকাশ করা দলের নেতারা।

আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার আগে তারা বলেন, আমরা মনে করি, মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ছিল একটি শোষণমুক্ত ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। যারা এটা মানেন না বা বিশ্বাস করেন না এবং এই অঙ্গীকার ভঙ্গ করে রাষ্ট্রকে ভুল পথে নিয়ে এসেছেন তারা কেউ দেশের প্রকৃত বন্ধু নন।

শনিবার (০২ মে) সকাল ১১টায় বিজয় নগরে ‘সায়হাম স্কাই ভিউ’ টাওয়ারে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নতুন দলের নাম ঘোষণার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু করে।

এর আগে ২৭ এপ্রিল ২০১৯ ‘জন আকাঙক্ষার বাংলাদেশ’ নামে তারা একটি রাজনৈতিক উদ্যোগের কথা জানায় সংবাদ সম্মেলন করে। ১৮ এপ্রিল দল ঘোষণার জন্য নির্ধারিত জাতীয় প্রেস ক্লাবের অডিটোরিয়ামও তারা বুকিং দিয়েছিলেন। কিন্তু করোনাভাইরাস উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে তা পিছিয়ে ২ মে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হলো।

দলের লক্ষ্য হিসেবে তারা ঘোষণা করেন, ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মৌলিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণরাষ্ট্রে উন্নীত করা।

২২২ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সাবেক সচিব এএফএম সোলায়মান চৌধুরীকে। সোলায়মান চৌধুরী জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। তিনি সম্প্রতি জামায়াত থেকে পদত্যাগ করেছেন। ২০০১ সালে সোলায়মান চৌধুরী ফেনী জেলা প্রশাসক থাকাকালে ফেনীর গডফাদার জয়নাল হাজারীকে বিতাড়ন করে মূলত আলোচনায় আসেন। সোলায়মান চৌধুরী বিএনপি জামায়াতের শাসনামলে একাধিকবার হাওয়া ভবন সিন্ডিকেটের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে সংবাদের শিরোনাম হয়েছিলেন।

এবি পার্টির সদস্য সচিব হয়েছেন মজিবুর রহমান মঞ্জু। তিনি দলের সংস্কারের দাবি তোলায় জামায়াত থেকে বহিস্কার হয়েছিলেন। মঞ্জু ইসলামী ছাত্র শিবিরের সভাপতি ছিলেন। এর আগে চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েরও সভাপতি ছিলেন। এবি পার্টির চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মঞ্জুর ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত এডভোকেটর গোলাম ফারুককে।

সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে মঞ্জু বলেন, এবি পার্টি ধর্ম ও মুক্তিযুদ্ধকে সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে জাতীয় ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবে। আমরা মনে করি, মুক্তিযুদ্ধ ও পবিত্র ধর্ম নিয়ে বাংলাদেশে সবচাইতে বেশি রাজনৈতিক অনৈক্য বিদ্যমান। মুক্তিযুদ্ধকে স্বীয় সম্পত্তি বা একক অর্জন মনে করে অন্যদের অবদানকে অস্বীকার করা এবং গড়পড়তা সবাইকে দেশবিরোধী ভাবা স্পষ্ট হটকারিতা ও স্বাধীনতার অঙ্গীকারের চরম লঙ্ঘন। তেমনিভাবে নিজেদের ইসলামের একমাত্র সোল এজেন্ট এবং বাকিদের পথভ্রষ্ট, নাস্তিক, বিপথগামী ও মুনাফেক ভাবা চরম অন্যায় ও অধার্মিকতা।

সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক ‘এবি পার্টি’র সবাই জামায়াত-শিবির থেকে আসা-এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মঞ্জু শ্রমিক আন্দোলনের নারী নেত্রী মিসেস বেবী পাঠানসহ, ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদসহ কয়েকজনকে পরিচয় করিয়ে বলেন, ডান-বাম, অন্যান্য ধর্মের লোকজনও এবি পার্টির সাথে আছে। দলের এটি আহ্বায়ক কমিটি। মূল কমিটি ঘোষণা করা হলে ৩৩ ভাগ নারী প্রতিনিধি রাখার বিষয়টিও আলোচনা হয়েছে।

নিজের জামায়াত ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো মুসলিম লীগ করেছিলেন। তাই না? উনি সেখান থেকে এসে নতুন একটা ধারণা দিয়েছিলেন। অনেকে সব সময় বলে যে, বৃক্ষ তোমার নাম কি- ফলে পরিচয়। আমরা যে কথাগুলো বলছি খুবই সুস্পষ্ট। আমাদের কথা-বক্তব্য ও কর্মধারায় প্রমাণ হবে আমরা কোন রাজনীতি ধারণ করছি। সেটাকে আপনারা বিবেচনায় নেবেন।

এবি পার্টির আহ্বায়ক নিজের নাম ঘোষণা হওয়ার পর এএফএম সোলায়মান চৌধুরী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারীর এই ক্রান্তিলগ্নে আমার ওপর আপনারা গুরু দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। কর্মজীবনে যেভাবে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করেছি, ঠিক দুর্নীতি ও লুটপাটের রাজনীতির পরিবর্তে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শামিল হয়ে জীবনের শেষ সময়টুকু আমি অতিবাহিত করতে চাই। আপনারা দোয়া করবেন।

সোলায়মান চৌধুরী আরও বলেন, দেশের যে কোনো নাগরিক এবি পার্টির সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন। আমাদের গঠনমূলক কঠোর সমালোচনা করতে পারেন। সমালোচনা আমাদেরকে পরিশুদ্ধ করবে এবং সামনে এগিয়ে চলার পথ দেখিয়ে দেবে। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমি দেশবাসীকে শরিক হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। আমাদের এই উদ্যোগ সফল হবে ইনশাল্লাহ।

জামায়াত থেকে পদত্যাগ করা জামায়াতের সাবেক এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক একজন সজ্জন মানুষ, একজন খ্যাতিমান আইনজীবী। উনি আমাদের উপদেষ্টা, আমরা উনার কাছ থেকে উপদেশ নিয়ে থাকি। উনি যদি দেশে আসলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। শুধু ব্যারিস্টার রাজ্জাক সাহেব না, আপনারা দেখেছেন অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মিটিংয়ে এসেও আমাদেরকে পরামর্শ দিয়েছেন, অধ্যাপক ফজলুল হক, ইফতেখার আহমেদ, গৌতম দাশসহ অনেকের থেকে আমরা সহযোগিতা ও পরামর্শ নিয়েছি।
এবি পার্টির সভাপতি ও সেক্রেটারি দুই মেয়াদের বেশি কেউ নির্বাচিত হতে পারবেন না।

পাশাপাশি দলের কোনো ছাত্র শাখা থাকবে না, ১৮ বছরের উপরে বয়স হলে বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিক এবি পার্টির সদস্য হতে পারবেন বলে জানান ব্যারিস্টার তাজুল ইসলাম।

সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে দলের একটি করে ‘শ্যাডো কমিটি’ বা ‘ছায়া কমিটি’ থাকবে, যারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে সুপারিশ ও দিক-নির্দেশনা দেবে বলেও জানান তিনি।

এফএম/এসএ

Source link