কুরবানীর ফযীলত ও জরুরী মাসাইল পর্ব – ৪

1
571
কুরবানীর ফযীলত ও জরুরী মাসাইল পর্ব - ৪
কুরবানীর ফযীলত ও জরুরী মাসাইল পর্ব - ৪

কুরবানীর ফযীলত ও জরুরী মাসাইল

✍ গোলাম সামদানী

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন, (তরজমা) “আপনি আপনার প্রতিপালকের জন্য নামায পড়ুন এবং কুরবানী করুন।” (সূরা কাউছার-২)

বিনা অনুমতিতে অপরের পশু কুরবানীর করার নিয়ম

মাসয়ালা (১) – দুই ব্যক্তি ভুল করে একে অপরের পশু যদি জবেহ করে  থাকে  তাহলে   উভয়ের  কুরবানী হয়ে যাবে।  পশুর  মাংস  খাবার  পর  নিজেদের  ভূল  বুঝতে  পারলে   একে  অপরের  নিকট  ক্ষমা  চেয়ে   নিবে।  যদি  একে অপরকে ক্ষমা করতে রাজি  না হয়  তাহলে একে অপরের নিকট হতে  নিজ  নিজ পশুর মূল্য গ্রহণ করবে এবং  তা  সাদকা করে দিবে (দুররে    মুখতার   ও  রদ্দুল মুহতার)।

10-Minute-Madrasah-Group-Join

মাসয়ালা   (২)    -   ইচ্ছাকৃত  বিনা   অনুমতিতে  অপরের কুরবানীর  পশু   নিজের নামে জবেহ করলে   যদি  পশুর মালিক    জবেহ    কারীর    নিকট    হতে    জরীমানা    গ্রহণ  করতে   রাজি     হয়   তাহলে   জবেহ   কারীর    পক্ষ     হতে কুরবানী   হয়ে   যাবে।   অন্যথায়   জবেহ    কারী    নিজের নামে জবেহ করলেও মালিকের পক্ষ হতে কুরবানী হয়ে যাবে (রদ্দুল মুহতার)।

মাসয়ালা   (৩)  -  যদি  কোনো   ব্যক্তি    অপরের    ছাগল  জোর পুর্বক নিয়ে  কুরবানী করে    থাকে  এবং ছাগলের  মালিক তার নিকট হতে জরিমানা নেয় তাহলে কুরবানী জায়েজ হয়ে যাবে। কিন্ত কুরবানীকারী গোনাহগার হয়ে যাবে,    এজন্য   তওবা   করা   জরুরী।   মালিক  জরিমানা গ্রহণ  করে  জবেহ  করা  ছাগল   নিয়ে  থাকলে   কুরবানী জায়েজ হবেনা (রদ্দুল মুহতার)।

মাসয়ালা    (৪)    -   পোষণী   ছাগলের   কুরবানী   জায়েজ হবেনা।   কারণ    সে   পোষণী  নিয়েছে  সে  প্রকৃত   পক্ষে তার মালিক নয় (রদ্দুল মুহতার)।

আরো পড়ুন:  কুরবানীর ফযীলত ও জরুরী মাসাইল পর্ব – ২

মাসয়ালা   (৫)  -   নিলামের  পশু   কুরবানী  জায়েজ    নয় কারণ নিলামকারী পশুর প্রকৃত মালিক নয়।  (বাহারে – শরিয়াত)

মাসয়ালা  (৬)  -  দুই  ব্যক্তি  একটি  পশুর  মালিক  হলে  উক্ত পশুর কুরবানী  কোনো  পক্ষের জন্য জায়েজ  নয়। দুই    ব্যক্তি    দুইটি    পশুর   সমান   সমান   মালিক     হলে  দুইজন    দুইটি    পশুর    কুরবানী    করে    দিলে    উভয়ের  কুরবানী জায়েজ হবে। (রদ্দুল মুহতার)

মাসয়ালা   (৭)  -   যদি   কোনো    ব্যক্তি   নির্দিষ্ট   না  করে নিজের   পক্ষ  হতে  এবং  নিজ   নাবালক   পাঁচ  সন্তানের  পক্ষ   হতে   ছয়টি     বকরী  কুরবানী  করে  থাকে  তাহলে সবার      পক্ষ        হতে      কুরবানী       জায়েজ      হয়ে      যাবে (আলমগিরী)।

স্বামী স্ত্রী এর পরস্পর সুখে থাকার অবাক করা ১২টি উপায়

মাসয়ালা  (৮) – যদি  কোনো  ব্যক্তি  নিজের  পক্ষ  হতে  এবং নাবালক   সন্তানের পক্ষ  হতে  একটি গরু কুরবানী করে  থাকে  তাহলে  সবার পক্ষ  হতে কুরবানী  জায়েজ  হয়ে  যাবে। বালেগ সন্তানের বিনা  অনুমতিতে কুরবানী জায়েজ হবেনা। অনুরূপ যেসমস্ত বালেগ সন্তানের নামে কুরবানী  করা  হয়েছে  যদি  এদের  মধ্যে  দু’একজনের  অনুমতি    না   থাকে    তাহলে   কারো   কুরবানী    জায়েজ  হবেনা। (আলমগিরী)

মাসয়ালা (৯) – যদি কোনো ব্যক্তি অবৈধ ক্রয়ের বকরী নিয়ে কুরবানী করে থাকে তাহলে বিক্রেতা ইচ্ছা করলে বকরীর   মূল্য   গ্রহণ    করতে     পারে    অথবা   জবেহকৃত বকরী নিতে পারে। যদি মূল্য গ্রহণ করে  থাকে তাহলে জবেহ কারির দায়িত্ব কিছুই থাকবেনা। যদি জবেহকৃত বকরী গ্রহণ করে   থাকে তাহলে   কুরবানী   দাতার জন্য জবেহ      কৃত      বকরীর     মূল্য     সাদকা     করতে     হবে।  (আলমগিরী)

মাসয়ালা   (১০)   -    দান   সূত্রে   পাওয়া    ছাগল   -   গরুর কুরবানী      করা       জায়েজ।      দানে      পাওয়া       ছাগলের  কুরবানীর    পর  যদি   দাতা  জবেহ   করা   ছাগল   ফিরত নিয়ে    থাকে তাহলে কুরবানী   দাতার  কুরবানী জায়েজ হয়ে    যাবে    এবং    তার      দায়িত্বে    কিছু    সাদকা     করা ওয়াজিব নয় (আলমগিরী)।

কুরবানী করার নিয়ম

কুরবানী  করার  পূর্বে  পশুকে  পানাহার   করিয়ে    দিবে। অস্ত্রকে ভালো করে ধার দিয়ে দিবে। পশুকে বাম কাত করে শোয়াবে যাতে তার মুখ কিবলা দিকে হয়ে থাকে। নিজের ডান পা পশুর সামনের ডান রানের উপর রেখে ধারালো অস্ত্র দ্বারা দ্রুত জবেহ করে দিবে।

জবেহ করার পূর্বে –

“ইন্নি      ওয়াজজাহতু     ওয়াজহিয়া      লিল্লাজী      ফাতারস  সামাওয়াতি     ওয়াল    আরদ্বা    হানিফাউ     ওয়ামা    আনা মিলান মুশরিকীন”

“ইন্না      সালাতী      ওয়া        নুসুকী      ওয়া      মাহ       ইয়াইয়া ওয়ামামাতী লিল্লাহী রব্বিল ‘আলামীন। লা শারীকা লাহু ওয়াবি  জালিকা উমিরতু  ওয়া আনা মিনাল মুসলেমীন    আল্লাহুম্মা      লাকা       ওয়ামিনকা        বিসমিল্লাহি       আল্লাহু আকবর”

যদি কুরবানী নিজের পক্ষ হতে দেয়া হয় তাহলে জবেহ করার পর বলবে – “আল্লাহুম্মা  তাকাব্বাল  মিন্নী   কামা   তাকাব্বালতা    মিন খলিলিকা ইব্রাহীমা  আলাইহিস  সালাম  ওয়া  হাবীবিকা মুহাম্মাদিন সাল্লালাহু তায়ালা আলাইহি ওসাল্লালাম”

জবেহ   এমনি   ভাবে   করতে   হবে   যাতে   চারটি   শিরা  কেটে  যায়,   কমপক্ষে  তিনটি  শিরা   কাটা   জরুরী।  খুব বেশি  কেটে  গরদানের হাড় পর্যন্ত অস্ত্র   পৌঁছিয়ে দেয়া উচিৎ নয়, তাতে  বিনা  কারণে পশুকে  বেশি কষ্ট  দেয়া হয়।  জবেহ করার  পর  যতক্ষণ   পর্যন্ত সম্পূর্ণ   ঠান্ডা না হয়ে যায় ততক্ষণ পর্যন্ত তার পায়ের শিরা কাটা চামড়া ছাড়ানো উচিৎ নয়।


আরো পড়ুন:

সাদাকাতুল ফিতর কী এবং সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ : কিছু কথা (ভিডিও সহ)

ইতিকাফের বিভিন্ন মাসয়ালা মাসায়েল জেনে নিন ( ভিডিও সহ )

রূহের  অবস্থান-  কিতাবুর রূহ্  এর বর্ণনা

মৃত্যুর পর  রূহের  অবস্থান কোথায়?

স্বামী স্ত্রী এর পরস্পর সুখে থাকার অবাক করা ১২টি উপায়


যদি কুরবানী অন্যের পক্ষ হতে করা হয় তাহলে জবেহ করার পর বলবে – “আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন ফুলানিন কামা তাকাব্বালতা মিন খলিলীকা ইব্রাহীমা আলাইহিসালাম ওয়া হাবীবিকা মুহাম্মাদিন  সাল্লালাহু  তায়ালা  আলাইহি  ওসাল্লালাম”।

“ফুলানিন” এর স্থলে যার  নামে কুরবানী হবে তার নাম উচ্চারণ  করতে  হবে।  অনুরূপ  যদি  একাধিক  ব্যক্তির  নামে   কুরবানী   করা   হয়   তাহলে   ফুলানিন   এর   স্থলে  সবার নাম উচ্চারণ করতে হবে।

কুরবানীর জবাহ সম্পর্কিত কিছু মাসয়ালা

মাসয়ালা  (১) -  গলাতে কয়েকটি   শিরা থাকে ঐ শিরা  গুলো কেটে দেয়াকে জবেহ বলে।  যে  পশুর উক্ত শিরা গুলো   কেটে   দেয়া   হয়েছে   তাকে   জাবীহা   বলা   হয়।  ইসলাম   যে পশুগুলোর  জবেহ  করার  নির্দেশ  দিয়েছে, বিনা   জবেহতে   ঐ   পশুগুলো   খাওয়া   হারাম।   (দুররে  মুখতার ও বাহারে শরীয়ত)

মাসয়ালা  (২)  -  মানুষের  আয়ত্বে   যেসমস্ত  পশু   থাকে সেগুলো হালাল করার নিয়ম  দুই প্রকার। যথা – জবেহ ও নহর। গলার শেষাংশে বল্লম বা খঞ্জর ইত্যাদি মেরে শিরাগুলো  কেটে  দেয়াকে নহর বলা  হয়। উটকে নহর  করা  এবং  গরু, ছাগল   ইত্যাদিকে জবেহ  করা সুন্নাত। তার ব্যতিক্রম  করা  অর্থাৎ  উটকে  জবেহ  এবং   ছাগল গরুকে  নহর করা মকরুহ ও সুন্নাতের বিপরীত। অবশ্য এই   প্রকার  ব্যতিক্রমে  পশু হারাম  হবেনা (আলমগিরী ও দুররে মুখতার)।

সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে সহজ পদ্ধতিতে আরবি শিক্ষা | সহজ পদ্ধতিতে শিক্ষক ছাড়া কুরআন শিক্ষা

মাসয়ালা  (৩)  -  সিনার  উপর  হতে  সমস্ত  গলা  জবেহ  করার স্থল। অবশ্য গলার মাঝ খানে জবেহ করা উত্তম (হিদায়া)

মাসয়ালা  (৪) – হুলকুম যা হতে শ্বাস  প্রশ্বাস যাতায়াত  করে  থাকে।  নলী, যা    হতে   খাদ্য প্রবেশ করে থাকে। হুলকুম ও নলীর আশেপাশে দুইটি শিরা থাকে, যা হতে রক্ত  চলাচল করে থাকে। জবেহ   এমন প্রকারে করতে  হবে যাতে চারটি  শিরা  কেটে যায়।  যদি তিনটি   কেটে যায়    তাহলেও    হালাল    হবে।    অনুরূপ     চারটি     মধ্যে প্রত্যেকটির অধিকাংশ   কেটে  গেলে হালাল হবে। আর যদি   প্রত্যেক  শিরার অর্ধাংশ কেটে যায়  এবং    অর্ধাংশ বাকী     থেকে     যায়,    তাহলে     পশু      হালাল    হবে    না। (আলমগীরি)

কুরবানীর ফযীলত ও জরুরী মাসাইল এর ১ম পর্বটি পড়ে নিন

মাসয়ালা  (৫) -  আজকাল  অধিকাংশ দেখা   যাচ্ছে যে, চামড়ার     মূল্য      বেশি     হবার      কারণে      ব্যবসায়ীগণ  যথাস্থানে জবেহ না  করে   গলার  উপরে জবেহ করছে। এপ্রকার   অবস্থায়    যদি   তিনটি    শিরা    কেটে   না   যায়, তাহলে  পশু হালাল হবে   না। (দুররে   মুখতার ও রদ্দুল মুহতার)

মাসয়ালা (৬) – বাজারী ব্যবসায়িদের জবেহ করা পশুর মাংস  ভক্ষণের    জন্য অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন  করা জরুরী (বাহারে – শরিয়াত)।