আহলে বাইতের নাজাতের ব্যাপারে বিরোধীদের ভুল ব্যাখ্যা খণ্ডন

আহলে বাইতের নাজাতের ব্যাপারে বিরোধীদের ভুল ব্যাখ্যা খণ্ডন

আহলে বাইতের নাজাতের ব্যাপারে বিরোধীদের ভুল ব্যাখ্যা খণ্ডন

প্রশ্নঃ আচ্ছা। সহীহ হাদীসে দেখা যায় যে- নবী করিম (দঃ) বলেছেনঃ

قَالَ یَافَاطِمَةُ بِنْتُ مُحَمَّدٍ یَاصَفِیَّةُ بِنْتُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ یَابَنِیْ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ اِنْقِذُوْا اَنْفُسَکُمْ مِّنَ النَّارِ فَاِنِّیْ لَااَمْلِكُ مِنَ اللهِ شَیْٸًا.

অর্থ : “হে মুহাম্মদ (দঃ)- এর কন্যা ফাতেমা, হে সফিয়া বিনতে আবদুল মােতালিব, হে বনী আবদুল মুত্তালিব। তোমরা নিজেদেরকে দোজখের আগুন থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করাে। কেননা, আমি তােমাদের উপকারার্থে আল্লাহর পক্ষ হতে কোন কিছুর মালিক নই”। উক্ত হাদীসে বুঝা যায় যে নবী করিম (দঃ) তাঁদের জন্য কোন উপকার করতে পারবেননা। এ হাদীসের জবাব কি এবং হাদীস খানার প্রকৃত ব্যাখ্যাই বা কি?

উত্তর : হাদীসে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে- তন্মধ্যে বিবি ফাতেমা (রাঃ) বেহেস্তের নারীদের সর্দার। বিবি সফিয়া (রাঃ) নবী করিম (দঃ) -এর আপন ফুফু ও মুসলমান মুহাজির সাহাবীয়া- যিনি বিনা হিসাবে জান্নাতী। আবদুল মােস্তালিব বংশের অন্যান্য যারা মুসলমান হয়েছেন তাঁদেরকে উপলক্ষ্য করেই নবী করিম (দঃ) উপরােক্ত হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাহলে বুঝা গেলাে যে, মূলতঃ হাদীস খানা তাঁদের উদ্দেশ্যে নয়- বরং একটি মূলনীতি বর্ণনা করাই এর মূল লক্ষ্য। তা হচ্ছে নিজস্ব মূল পুজি না থাকলে অর্থাৎ ঈমান না থাকলে- নবী করিম (দঃ) কাউকে রক্ষা করতে পারবেন না। এমনকি নিজের বংশ হলেও নয়। ঈমান থাকলে শত গুনাহগার হলেও নবী করিম (দঃ) শাফাআত করবেন বলে অন্য হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে। সাধারন মুসলমানকে যখন শাফাআত করে কেয়ামতের দিনে তিনি রক্ষা করবেন, তখন নিজ বংশ এবং বেহেস্তের সুসংবাদ প্রাপ্ত নিজের আত্মীয়গনকে রক্ষা করতে পারবেন না- এটা কোন মতেই হতে পারেন। বর্ণিত হাদীস খানা অন্যান্য সমস্ত হাদীসের বাহ্যিক পরিপন্থী বিধায় এই হাদীস খানাকে বিভিন্ন ব্যাখ্যা সাপেক্ষে প্রহন করতে হবে। এটাই হাদীসের যাচাই- বাছই পদ্ধতি। তাহলে হাদীস খানার প্রকৃত ব্যাখ্যা কি? এ ব্যাপারে ওলামায়ে কেরাম ও হাদীস বিশেষজ্ঞ ইমামগন যা বলেছেন -তার সার সংক্ষেপ নিন্মরূপঃ

১। প্রথম ব্যাখ্যাঃ বর্নিত হাদীস খানা ইসলামের প্রথম যুগে মক্কা শরীফে বর্নিত- যখন পর্যন্ত শাফাআতের আয়াত নাযিল হয়নি। নবী করিম (দঃ) যে পরকালে কাউকে শাফাআত করে রক্ষা করতে পারবেন- সে বিষয়ে তাঁকে তখনও অবহিত করা হয়নি। মােট কথা- হাদীস খানা পরবর্তীতে মানসুখ হয়ে যায়। মদিনা শরীফে পরবর্তীতে শাফাআত সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীস দ্বারা মক্কা শরীফে বর্নিত উপরােক্ত হাদীস খানার হুকুম রদ হয়ে যায়। সুতরাং মানসুখ হাদীস দ্বারা কোন দলীল পেশ করা বৈধ নয়। আশ্চর্যের কথা, বিরােধীরা জেনে শুনেই মানসুখ হাদীস ব্যবহার করে নবীজীর প্রকৃত শানকে গােপন করে মানুষকে থােকা দিচ্ছে। নবীজীর প্রকৃত শান গােপনকারীগণ অবশ্যই কাফের বলে গন্য।



২। দ্বিতীয় ব্যাখ্যা যদি হাদীস খানাকে বহাল বলেও ক্ষনিকের জন্য স্বীকার করে নেয়া হয়, তাহলে لَااَمْلِكُ مِنَ اللهِ شَیْٸًا হাদীসের এই অংশটুকু অবশ্যই ব্যাখ্যা সাপেক্ষ বিষয়। এই অংশে কলা হয়েছে- “নবী করিম (দঃ) মানুষের উপকারের ক্ষেত্রে আল্লাহর পক্ষ হতে কিছুরই মালিক নন। অথচ অন্যান্য হাদীসে প্রমান পাওয়া যায় যে, তিনি পরকালে শাফাআতের মালিক এবং সুপারিশ করে গুণাহগারকেও রক্ষা করার অধিকারী। তিনি হাউজে কাউছারেরও মালিক। দোজখ হতে রেয়ায়েতী মেয়াদে দোজখ বাসী কে বের করে আনার অনুমতি প্রাপ্ত- ইত্যাদি। যাবতীয় মঙ্গলের মালিকানা তাঁকে আল্লাহ দান করেছেন। সুরা ইন্না আতাইনাকাল কাউছার -সূরাই -এর প্রমান। “আতাইনা” শব্দ এবং “কাউছার” শব্দ দুটি অতি ব্যাপক। আরবী اِعْطَاءٌ শব্দটির অর্থ হলাে- চির সত্ব দান করা এবং কাউছার অর্থ- খায়রে কাছির অর্থাৎ যাবতীয় মঙ্গল। অর্থাৎ এই সুরায় নবীজীকে যাবতীয় মঙ্গলের চির স্বত্ব দান করা হয়েছে। মদিনা শরীফে আসার পর এই সুসংবাদবাহী সুরা কাউছার নাজিল হয়েছে। এখন হাদীস খানার প্রকৃত ব্যাখ্যা তাফসীরে রুহুল বয়ান সহ বিভিন্ন তাফসীর ও হাদীস গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে নিন্মরূপেঃ

قَالَ العُلَمَاءُ لَاتُعَارِضُ بَیْنَ الْحدِیْثِ الْمَذْکُوْرِ وَبَیْنَ الْاَحَادِیْثِ الْوَارِدَةِ فِی فَضْلِ اَهْلِ بَیْتَهٖ صَلَّی اللهُ عَلَیْهِ وَسَلَّمَ لِاَنَّ مَعْنَی الْحَدِیْثِ اَنَّهٗ صَلَّی اللهُ عَلَیْهِ وَسَلَّمَ لَایَمْلِكُ لِاَحَدٍ مِّنَ اللهِ شَیْٸًا لَّاضَرًّا وَّلَانَفْعًا وَلٰکِنَّ اللهَ یُمَلِّکُهٗ نَفْعَ اَقَارِبِهٖ بَلْ جَمِیْعِ اُمَّتِهٖ بِالشَّفَاعَةِ الْعَامَّةِ وَالْخَاصَّةِ فَهُوَ لَایَمْلِكُ بِنَفْسْهٖ اِلَّا مَایُمَلِّکُهٗ لَهٗ مَوْلَاهٗ عَزَّ وَجَلَّ وَکَذَا قَوْلِهٖ صَلَّی اللهُ عَلَیْهِ وَسَلَّمَ وَفِیْ رِوَایَةٍ لَا اُغْنِیْ عَنْکُمْ مِّنَ اللهِ شَیْٸًا اَیْ بِمُجَرَّدِ نَفْسِیْ مِنْ غَیْرِ مَایُکَرِّمُنِیَ اللهُ بِهٖ مِنْ شَفَاعَةٍ اَوْ مَغْفِرَةٍ مِّنْ اَجْلِیْ وَنَحْوِ ذَالِكَ.

অর্থঃ হাদীস ও তাফসীর বিশারদ ওলামায়ে কেরাম বলেছেনঃ এই হাদীস এবং নবীজীর বংশধরগনের ফজিলত সম্পর্কীত অন্য হাদীস সমুহের মধ্যে কোন বিরােধ নেই। কেননা, বর্তমান হাদীস খানার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে “নবী করিম (দঃ) নিজে নিজে কারও উপকার বা অপকার করার মালিক নন; বরং আল্লাহ তায়ালা তাঁকে তাঁর আত্মীয় স্বজন সহ সকল উম্মতের উপকার করার মালিক বানিয়েছেন। এই উপকার করার মালিকানা তিনি পেয়েছেন সাধারন ও বিশেষ শাফাআত করার ক্ষেত্রে। সুতরাং তিনি নিজে নিজে মালিক নন; বরং তাঁর মাওলা আল্লাহ তায়ালাই তাঁকে মালিক বানিয়েছেন। তিনি বর্তমান হাদীসে স্বয়ং সম্পূর্ণ ও মৌলিক মালিকানা স্বীকৃতি প্রকাশ করেছেন। দানকৃত মালিকানার অস্বীকৃতি তাে এই হাদীসে নেই। (“মালাকা ইয়ামলিকু” অর্থ নিজে নিজে মালিক হওয়া এবং “মাল্লাকা ইউ মাল্লিকু” অর্থ- অন্যর দ্বারা মালিক হওয়া) নবী করিম (দঃ) প্রথমটির অস্বীকৃতি জানিয়েছেন- দ্বিতীয়টির নয়। ইহাই সঠিক ব্যাখ্যা।

অনুরূপ ভাবে অন্য রেওয়ায়াতে বর্নিত “আমি খােদার পক্ষ থেকে তোমাদের কোন কাজে আসবােনা” এই হাদীস খানার মর্মও এই যে, আমি নিজে নিজে তােমাদের কাজে আসবােনা। কিন্তু আমার রব আমাকে শাফাআত ও মাগফিরাতের ক্ষমতা দান করে সম্মানিত করেছেন। এই পর্যায়েই আমি উপকার করার অধিকার লাভ করেছি”। আত্মীয় স্বজনের ক্ষেত্রে বর্ণিত হাদীস নিজ নিজ স্থানে বহাল। ব্যাখ্যা করার অবকাশ নেই।

৩। তৃতীয় ব্যাখ্যাঃ “লা আমলিকু” হাদীস খানার উদ্দেশ্য হচ্ছে সতর্ক করা, ভভয়ভীতিতে রাখা এবং খােদার রহমতের প্রত্যাশী করে রাখা যাতে কেউ ঈমান ও আমলের ক্ষেত্র উদাসীন না হয়ে যায়। এরূপ হাদীসকে মােহাদ্দেসীনে কেরাম তাহবীর ও তাহদীদ বা ভয়ভীতি প্রদর্শন মূলক হাদীস বলে আখ্যায়িত করেছেন।

একদল লােক আছে – যারা খুঁজে খুঁজে নবীজীর অক্ষমতা ও অসহায়ত্ব প্রমান করার জন্য বিভিন্নি ফেরকা বের করে। তারা অন্যান্য দিক বিবেচনা না করে এবং ব্যাখ্যা গ্রন্থ না দেখেই সােজাসােজি হাদীস ও কোরআনের শুধু অর্থ বলে মানুষের মনে সন্দেহের সৃষ্টি করে। এরা প্রকৃত পক্ষেই নবীজীর দুশমন। আল্লাহ্ আমাদেরকে এসব লােকের সংশ্রব থেকে রক্ষা করুন। – অনুবাদক।

This post was last modified on September 3, 2020 12:54 pm