আশুরাতে মাতম করা ও তাজিয়া বের করা কি বৈধ? পর্ব-১

0
499

আশুরাতে মাতম করা ও তাজিয়া বের করা কি বৈধ? ধারাবাহিক পর্ব-১

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার জন্য , যিনি আপন বান্দাদেরকে ধৈৰ্য্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য চাওয়ার হুকুম দেন । অসংখ্য দরূদ সালাম নবী ( দঃ ) এর উপর , যিনি ধৈর্যশীল ছিলেন এবং আপন উম্মতকে ধৈর্য ধারণ করার আদেশ দেন , তার পরিবার ও আসহাবের উপর যারা ধৈর্য ধারণ করে ইসলামের পতাকাকে উড্ডিন করেছিলেন ।

সম্মানিত পাঠক ভাইয়েরা , আজ আমরা ইসলাম ধর্মকে আমাদের পরিবারে , সমাজে , রাষ্ট্রে স্বাভাবিকভাবে পেয়েছি , কিন্তু ঐ ইসলামকে সমগ্র বিশ্ব ব্যাপী পৌছাতে আল্লাহর বান্দাদেরকে ধৈর্যের সাথে কাজ চালাতে হয়েছিল । মুসলিম জাতির যতদিন ধৈর্য্য ছিল , ততদিন উন্নতির শিখরে উপনীত ছিলেন , আর যখন ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলে , ধীরে ধীরে সেই মান – সম্মান নেতৃত্ব সব হারাতে থাকে । বর্তমান মুসলিম সমাজ আরাম আয়েশ প্রিয় । বিন্দু মাত্র কষ্ট করতে ও তারা রাজি নন ।

10-Minute-Madrasah-Group-Join

অথচ নবী ( দঃ ) ও তার সাহাবাদের জীবন পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় , তারা কত ত্যাগ ও কষ্টের মাধ্যমে এই ইসলামকে কায়েম করেছেন । তাদের পরে নবী ( দঃ ) এর আওলাদ ও আল্লাহ তায়ালার মাকবুল বান্দা , যাদের আমরা আল্লাহর অলি হিসেবে চিনি , তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও অস্বাভাবিক ধৈর্য্যের মাধ্যমে ইসলামকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন ।

তারা যদি এভাবে আরাম আয়েশ প্রিয় থাকত , কখনো ইসলামের পতাকা উড্ডিন করতে পারতেন না। আজ আমরা নিজেদের ব্যাপারে ধৈৰ্য্য ধারণ করছিনা , সাথে সাথে যারা ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়ে ইসলাম কায়েম করেছেন , যাদের তাজা রক্তের বদলায় ইসলাম এই পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় আছে , তাদের কুরবাণীর উপর আমরা ধৈর্য্য ধারণ করতে পারছিনা।


ইসলামে ওযুর গুরুত্ব ও আধুনিক বিজ্ঞান – অযু ও বিজ্ঞান

কুরবানীর ফযীলত ও জরুরী মাসাইল পর্ব – ৬

ইসলামে ওযুর গুরুত্ব ও আধুনিক বিজ্ঞান – অযু ও বিজ্ঞান

কুরবানীর ফযীলত ও জরুরী মাসাইল পর্ব – ৬

কুরবানীর ফযীলত ও জরুরী মাসাইল পর্ব – ১

কুরবানীর ফযীলত ও জরুরী মাসাইল পর্ব – ২

কুরবানীর ফযীলত ও জরুরী মাসাইল পর্ব – ৪


যেমন, মুহরমের দশ তারিখ ময়দানে করবালায় আওলাদে রাসুল ( দঃ ) ইমাম আলী মকাম হুসাইন ইবনে আলী ( রঃ ) ও তার আওলাদের তাজা রক্তকে ঢেলে দিয়েছিলেন, ইসলামকে জীবিত রাখার লক্ষ্যে , উনারাই বাস্তব কুরআনের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন । কুরআনের আয়াতের তাফসীর , তরজুমা ইত্যাদি উনারা বলার মাধ্যমে না করে বরং বাস্তবতার মাধ্যমে দেখাতেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন ,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
অর্থঃ হে মুমিন গন! তোমরা ধৈর্য্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চিতই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন।(সুরা বাকারা- ১৫৩)
(১)
দেখা যায় এই আয়াতের বাস্তবতা ঘটালেন ময়দানে কারবালায় আওলাদে রাসুল ( দঃ ) ও তার প্রিয়জনরা । উনাদের কে প্রিয় জন্মভূমি মদিনা মুনাওয়ারাকে ছেড়ে দিয়ে , মক্কা হয়ে সেই কারবালা পর্যন্ত এসে একে অপরের সামনে আপন জান ও রক্তকে বিসর্জন দিতে হয়েছিল । এমন কি ইমাম হুসাইন ( রাঃ ) রক্তমাখা শরীর নিয়ে , ইয়াজীদিদের থেকে সময় চেয়ে নিয়ে । প্রস্তুত হয়ে গেলেন , আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করতে নামাযের সিজদার মাধ্যমে । দেখা গেল কুরআন পাকে আল্লাহ তায়ালার বাণীর সঙ্গে ইমাম হুসাইন (রাঃ)’র জীবন সাদৃশ্যপূর্ণ ।

এটা শুকরিয়ার ব্যাপার কান্নার কারণ নয় , ইমাম হুসাইন ( রাঃ ) পরাজয় বরণ করেন নি বরং উনি কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত তার রক্তের বদৌলতে ইসলামকে জীবিত রেখেছেন । এমন শাহাদাতের চেয়ে বড় নেয়ামত আর কি হতে পারে ? যেই নেয়ামতকে শহীদরা জান্নাতে গিয়েও তালাশ করবে । ইমাম হুসাইন ( রাঃ ) তো নিয়ামতের সাগরে ডুব দিয়েছেন , আমাদের অধৈৰ্য্য হওয়ার কি কারণ ? উনি পরাজিত হলে অধৈর্য্য হওয়ার কারণ ছিল । তিনি পরাজিত ও হননি অস্তিত্ব হীন ও হননি , এখনো জীবিত আছেন যার কথা আল্লাহ তায়ালা বলেন –
وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِنْ لَا تَشْعُرُونَ ﴿١٥٤﴾
অর্থঃ তোমরা ঐ সমস্ত বান্দাদেরকে মৃত বলো না যারা আল্লাহর রাস্তায় । শহীদ হয়েছেন বরং তারা জীবিত কিন্তু তোমাদের সেই অনুভূতি নেয় ।(সুরা বাকারা- ১৫৪)
অন্য আয়াত আল্লাহতায়ালা বলেন-

যারা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়েছেন , তোমরা তাদের মৃত বলে ধারণা কর না বরং তারা জীবিত শুধু তাই না , তাদের কাছে তাদের প্রভুর পক্ষ থেকে রিযিক ও আসে ।
উল্লেখিত আয়াতের মাধ্যমে বুঝা যায় , যারা ইসলামকে কায়েম করার লক্ষ্যে শহীদ হয়েছেন , তারা মৃত নন বরং জীবিত এবং রিযিক ও পাচ্ছেন। ইমাম হুসাইন ( রাঃ ) ও তার সঙ্গীরা মৃত নন , এখনো উনারা আছেন এবং খাওয়ার খাচ্ছেন । ধ্বংস হয়েছে , ইয়াজিদ ও তার বাহিনীরা যেমন, এক কবি কত সুন্দর বলেছেন-
(২)
কবি ইমাম আলী মকাম ( রাঃ ) কে সম্বোধন করে বলেন , অনেক হায়াত আসবে জালিম চলে যাওয়ার পর , হে হুসাইন ( রাঃ ) আপনার শাহাদতের মাধ্যমে আমাদের জীবন শুরু । শহীদ হয়েছেন আপনি , আসলে নিশ্চিহ্ন /ধ্বংস হল ইয়াজিদ এভাবে ইসলাম জিন্দা হয় প্রত্যেক কারবালার পরে । আমাদের দেশে অনেককে দেখা যায় , ইমাম হুসাইনের মুহাব্বত দেখাতে গিয়ে , শরীরের উপর আঘাত আনে , এমনকি ছুরি দিয়ে নিজের শরীরকে রক্তাত করে ফেলে এবং রক্তার্ত অবস্থায় মিছিল বের করে এটাতো ধৈর্য্যের প্রমাণ নয় , বরং ধৈর্য্য হল আপনি ইমাম হুসাইন ( রাঃ স্মরণে মাহফিল করুন এবং আওয়াজ ছাড়া কেঁদে কেঁদে চোখের পানি ফেলুন । এই চোখের পানি আপনার নাজাতের ও জান্নাত পাওয়ার বড় মাধ্যম হবে । আল্লাহ ও তার রাসুল ( দঃ ) এর ফয়সালা হল , নেয়ামত পাওয়ার পর শুকরিয়া আদায় করা এবং মছিবতে ধৈর্য্য ধারণ করা যেমন কুরআন পাকে আল্লাহ তায়ালার বাণী –

অর্থঃ হে রাসুল ( দঃ ) আপনি শুভ সংবাদ দেন এই সমস্ত ধৈর্য্য ধারণকারীদের জন্য , যারা মছিবত আসলেই বলে , নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য , আল্লাহর দিকে আমাদের প্রত্যাবর্তন। আল্লাহ বলেন , তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও রহমত রয়েছে , তারাই হিদায়ত প্রাপ্ত ।

 

(৩)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন ,
أُولَئِكَ يُؤْتَوْنَ أَجْرَهُمْ مَرَّتَيْنِ بِمَا صَبَرُوا
অর্থঃ- তাদেরকে ধৈর্য্য ধারণ করার কারণে দু ‘ বার বদলা দেওয়া হবে । ( সুরা কছছ- ৫৪ )
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালার বাণী –
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ ﴿١٠﴾
অর্থঃ- নিশ্চয় ধৈর্য্য ধারণ কারীদের প্রতিদান অসংখ্য নেয়ামতে ভরপুর করা । হবে । ( সূরা জুমার – ১০ )
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন –
وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ ﴿٤٦﴾
অর্থঃ- তোমরা ধৈর্য ধারণ কর , নিশ্চয় ধৈর্য ধারণকারীর সাথে আল্লাহর সাহায্য রয়েছে । ( সুরা আনফাল ৪৬ )
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন –
اسْتَعِينُوا بِاللَّهِ وَاصْبِرُوا
অর্থঃ- আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও ও ধৈর্য ধারণ কর । (সুরা আরাফ – ১২৮ )
বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদেরকে আল্লাহ বলেন –
بَلَى إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُمْ مِنْ فَوْرِهِمْ هَذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ آلَافٍ مِنَ الْمَلَائِكَةِ مُسَوِّمِينَ ﴿١٢٥﴾
অর্থঃ- হ্যা, তোমরা যদি ধৈর্য ধারণ কর এবং মুত্তাকি হও , তাহলে উপর থেকে তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যকারী পাঁচ হাজার ফেরেস্তা দলে দলে নাযিল হবে । ( আলে ইমরান – ১২৫)
(৪)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন ,
وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ ﴿١٧٧﴾
অর্থঃ- যখন আজাব চলে আসে এবং বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা স্বরূপ মছিবত চলে আসে , যারা ধৈর্য ধারণ করে , তারাই সত্যের মধ্যে আছে এবং তারাই মুত্তাকি । ( সুরা বাকারা – ১৭৭ )
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَئِكَ لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ ﴿١١﴾
অর্থঃ- হ্যা, যারা ধৈৰ্য্য ধারণ করে এবং ভাল কাজ করে , তাদের জন্য ক্ষমা ও বড় প্রতিদান রয়েছে । ( সুরা হুদ ১১)
হে ঈমানদাররা , ধৈর্য ধারণ কর এবং একে অপরকে ধৈর্যের হুকুম দাও ও সম্পর্ক স্থাপন কর । সূরা আছরে আল্লাহ তায়ালা বলেন –
إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ ﴿٢﴾ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ ﴿٣﴾

অর্থঃ- নিশ্চয় সমগ্র মানব গোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্থ রয়েছে , হ্যা যারা ইমান আনয়নের পর ভাল কাজ করে এবং একে অপরকে সত্যের অছিয়ত করে , একে অপরকে ধৈর্য্য ধারণের অছিয়ত করে , তারা কখনো ক্ষতিগ্রস্থ নয় । ( সূরা আছর )
উল্লেখিত আয়াতের মাধ্যমে বুঝা যায় নিশ্চয় যারা ধৈর্য্য ধারণ করে তাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে যথেষ্ট নেয়ামতের শুভ সংবাদ আল্লাহ তায়ালা নিজেই দিয়েছেন । মুছিবতে ধৈর্য্য ধারণ এবং নেয়ামত পাওয়ার পর শুকরিয়া আদায় করার ব্যাপারে আমাদের প্রিয় রাসুল ( দঃ ) আমাদেরকে উৎসাহিত করেন । যেমন – নবী ( দঃ ) এর বাণী –
قال النبى ﴿صلى الله عليه وسلم﴾ يقول الله تعلى اذا وجھت الى عبد من عبيدى مصيبة فى بدنه اوما له اوولده ثم استقبل ذالک بصبر جميل استحيت يوم القيمة ان انصب له ميزان او انشرله ديوان ﴿ نزهة المجالس ج ا صف٦٥﴾

(৫)
রাসুল ( সঃ ) বলেন , আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন , আমি আমার কোন বান্দাকে যদি তার শরীর , সম্পদ বা সন্তানের উপর মছিবত দিয়ে থাকি , বান্দা ধৈর্যের মাধ্যমে ঐ মছিবতের মোকাবেলা করলে , তার জন্য । কিয়ামতের ময়দানে পাপ – পূণ্য মাপার দাড়িপাল্লা দাড় করাতে বা তার আমলের খাতা খুলতে আমি লজ্জা পাই । অর্থাৎ তাকে কোন ধরণের হিসাব ছাড়া জান্নাত দান করে দিয়ে থাকি । ( নুযহাতুল মাজালিস ১ খন্ড – পৃষ্ঠা ৬৫ )